নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায় ‘টাকশাল’

যেখানে কাঁড়ি কাঁড়ি ধাতব মুদ্রা বা টাকা ছাপানো হয় সেটাকেই টাঁকশাল বলে। ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরই শাসকরা শুধু রাজধানী থেকেই নয়, অপরাপর প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো থেকেও মুদ্রা তৈরি করতে শুরু করেন।

সাম্রাজ্যের বিস্তৃৃতির সঙ্গে সঙ্গে টাঁকশালের সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলার আদি টাঁকশাল শহর লখনউ (ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের রাজধানী)।

১২০৫ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি কর্তৃক মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই লখনউতি একটি রাজধানী শহর হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং প্রথম টাঁকশাল শহর হওয়ারও গৌরব অর্জন করে। টাঁকশাল শহর হিসেবে সোনারগাঁর যাত্রা শুরু হয় সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহের (১৩০১-১৩২২) সময় থেকে।

এ ছাড়া বিভিন্ন সময় ফতেহাবাদ (ফরিদপুর), চাটগাঁ (চট্টগ্রাম), মুজাফফরাবাদ (পটিয়া উপজেলা) সহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন শহরে টাঁকশাল স্থাপনের প্রমাণ মেলে।

আমাদের টাঁকশালের পোশাকি নাম দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড। দেশের টাকা ছাপানোর একমাত্র প্রতিষ্ঠান এটি। গাজীপুরে অবস্থিত টাঁকশালের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৯ সালে।

১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও দেশে কিছুদিন পাকিস্তানি টাকার প্রচলন ছিল। তখন ওই নোটগুলোতে ‘বাংলাদেশ’ লেখা স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হতো।

পাকিস্তানি মুদ্রার পরিবর্তে বাংলাদেশি টাকার প্রচলন শুরু হয় ১৯৭২ সালের ৪ মার্চ। আগে ভারত, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানি থেকে বাংলাদেশের নোট ছেপে আনা হতো।

ভিন্ন দেশ থেকে নোট ছেপে সময়মতো আনা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে দেশেই নোট মুদ্রণের ছাপাখানা হিসেবে ১৯৮৯ সালে টাঁকশালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। তার আগে ১৯৮৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ১ ও ১০ টাকার নোট ছাপানো হয়েছিল।

এখন ৯টি মূল্যমানের কাগজি নোট ছাপানো হয়। বর্তমানে এক টাকার নোট আর ছাপানো হয় না। এ ছাড়া সব স্মারক নোটও এই টাঁকশালেই মুদ্রিত। একটি নোট ছাপাতে প্রায় ৩০টি পর্যায় পার করতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের বিভিন্ন অফিসের প্রয়োজনমতো বিভিন্ন মূল্যমানের নোটের চাহিদা জানালে টাঁকশালের ভল্ট থেকে তা সরবরাহ করা হয়। উল্লেখ্য, আমাদের টাঁকশালে কোনো কয়েন তৈরি হয় না।

টাঁকশালে শুধু টাকাই ছাপা হয় না। সরকারের বিভিন্ন নিরাপত্তাসামগ্রীও এখানে ছাপানো হয়। যেমন—অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সঞ্চয়পত্র, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, রাজস্ব স্ট্যাম্প, স্মারক ডাকটিকিট, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ট্যাক্স লেবেল, ব্যাংকের চেক বই, প্রাইজবন্ড, শিক্ষা বোর্ডগুলোর বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার নম্বরপত্র, সনদ ইত্যাদি। এ ছাড়া কোনো কোনো কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুরোধে তাদের শিক্ষা সনদও মুদ্রণ করা হয়ে থাকে।

S.S.C

Leave a Comment