বাংলা নববর্ষের ইতিহাস,কিভাবে ১লা বৈশাখ উদযাপন রীতি এলো?, বাংলা নববর্ষের ইতিকথা

বাঙালি জীবনের অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন একটি উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ, বর্ষবরণের দিন, শুভ নববর্ষ। এ দিনটি প্রত্যেক বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে উৎসব আমেজ আর ফুরফুরে বাতাসের দিন বসন্ত। আলপনা আঁকা শাড়ি আর পাঞ্জাবি ছাড়া যেন এ দিনটিকে আর পালন করাই যায় না।

সঙ্গে লাল সবুজ আর সাদার মিশেলে হাতে, গালে ফুলকি আঁকা এখন হালফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছরই ক্রমশ বাড়ছে বর্ষবরণের আমেজ।

স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের সরাসরি সম্প্রচার, রমনার বটমূল থেকে পুরো ঢাকা হয়ে প্রতিটি বিভাগীয় শহর, জেলা শহর, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামে গ্রামে পালন করা হয়।

শুধু গ্রাম নয়, শহর-উপশহর রাজধানী ঢাকারও বিভিন্ন অলিগলিতে বসে বৈশাখী মেলা। পান্তা-ইলিশ, বাঁশি, ঢাক-ঢোলের বাজনায় আর মঙ্গল শোভাযাত্রায় পূর্ণতা পাচ্ছে বাঙালির এ উৎসবমুখরতা। এবার একটু ফিরে দেখা বাংলা নববর্ষের পথচলার ইতিহাস।

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস,কিভাবে ১লা বৈশাখ উদযাপন রীতি এলো?

পুরোনোকে ফেলে বছর ঘুরে আবারও চলে এলো পহেলা বৈশাখ। তবে এবারের বর্ষ বরণ প্রতিবারের ন্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা হবে না। গাওয়া হবে না গান রমনার বটমূলে, যাওয়া হবে না বৈশাখী মেলায়। তাই বলে নতুন বছর পূর্ব দিগন্তের লাল সূর্য বর্ষ বরণের গান ছাড়া কি বৈশাখ মাস আনবে না? তা তো কোনোভাবেই নয়!

ছোটবেলায় পড়ে ছিলেন না- “সময় এবং স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না“? তাই পূব দিগন্তে রাঙা আলো নিয়ে আগামীকালও নতুন বছর শুরু হবে। দেখতে দেখতে সময় কত দ্রুত চলে যায়। ভাবছেন গৃহবন্দি বর্ষ বরণ কেমন করে হবে, তাই তো? মন খারাপের কারণ নেই। সুন্দর সময় কাঁটাবার কিছু আইডিয়া দিবো। আর তার সাথে জানিয়ে দিবো বাংলা নববর্ষের ইতিহাস সম্পর্কে কিছু কথা।

কবে থেকে, কী কারণে ও কিভাবে এই দিনটি আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেলো, রীতি-নীতি নিয়ে সাজিয়েছি আজকের লেখাটি।

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস ও এটি উদযাপনের রীতি-নীতি 

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস 

বাংলা পঞ্জিকার প্রবর্তক ও মাসের নামকরণ

বাংলা নববর্ষ আমাদের সংস্কৃতিতে কিভাবে এলো তা জানতে হলে আমাদের অবশ্যই বাংলা নববর্ষের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে। পহেলা বৈশাখ বা পয়লা বৈশাখ পালন করা হয় বাংলা বছরের প্রথম মাসের প্রথম দিনে। এই বাংলা বছর বা বাংলা পঞ্জিকা কিভাবে এলো? প্রথমে সৌর পঞ্জি অনুসারে বাংলা মাস পালিত হতো অনেক প্রাচীনকাল থেকেই।

তখনও আসাম, তামিল নাড়ু, ত্রিপুরা, বঙ্গ, পাঞ্জাব প্রভৃতি সংস্কৃতিতে বছরের প্রথম দিন উদযাপনের রীতি ছিলো। তাহলে বাংলা নববর্ষের ইতিহাসে বাংলা বারো মাস কিভাবে এলো? আর এর দিন, ক্ষণ কিভাবে ঠিক করা হলো? বাংলা সনের প্রবর্তক নিয়ে সম্রাট আকবর বেশি আলোচিত হলেও, বাংলা পঞ্জির উদ্ভাবক ধরা হয় আসলে ৭ম শতকের রাজা শশাঙ্ককে। পরবর্তীতে সম্রাট আকবর সেটিকে পরিবর্তিত করেন খাজনা ও রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে।

প্রথমে আকবরের পঞ্জিকার নাম ছিল “তারিখ-এ-এলাহী” আর ঐ পঞ্জিকায় মাসগুলো আর্বাদিন, কার্দিন, বিসুয়া, তীর এমন নামে। তবে ঠিক কখন যে এই নাম পরিবর্তন হয়ে বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ হলো তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারে না। ধারণা করা হয় যে, বাংলা বারো মাসের নামকরণ করা হয়েছে বিভিন্ন নক্ষত্র থেকে। যেমন- বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ, জায়ীস্থা থেকে জৈষ্ঠ্য, শার থেকে আষাঢ়, শ্রাবণী থেকে শ্রাবণ এমন করেই বাংলায় নক্ষত্রের নামে মাসের নামকরণ হয়।

সম্রাট আকবর রাজস্ব আদায়ের জন্য কেনই বা নতুন পঞ্জিকা নির্ধারণ করলে?

ভারতবর্ষে মোগল সম্রাজ্য পরিচালিত হতো, হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে। আর হিজরি পঞ্জিকা চাঁদের উপর নির্ভরশীল। যেহেতু কৃষকদের কৃষি কাজ চাঁদের হিসাবের সাথে মিলতো না, তাই তাদের অসময়ে খাজনা দেয়ার সমস্যায় পরতে হতো। সেই কারণে খাজনা আদায়ে কৃষকদের যেন কোনো অসুবিধা না হয়, সম্রাট আকবর বর্ষ পঞ্জিতে সংস্কার আনেন।

তখনকার বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সম্রাট আকবরের আদেশে সৌর সন ও হিজরি সন এর উপর ভিত্তি করে বাংলা সনের নিয়ম তৈরি করেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে প্রথম বাংলা সন গণনা করা হয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবেই খাজনা আদায়ে এই গণনা কার্যকর শুরু হয়েছিল ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর থেকে। পূর্বে ফসল কাঁটা ও খাজনা আদায়ের জন্য এই বছরের নাম দেয়া হয়ে ছিলো ফসলি সন

পরে তা বঙ্গাব্দ আর বাংলা সন করা হয়। তখন চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে খাজনা, শুল্ক দিতে হতো কৃষকদের। তাই তখন থেকেই সম্রাট আকবর কৃষকদের জন্য মিষ্টি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। হালখাতার প্রচলনও সম্রাট আকবরের সময় থেকেই ব্যবসায়ীরা করেছে।

বর্তমানের বাংলা পঞ্জিকা ও বাংলা নববর্ষ পালন 

বর্তমানের বাংলা সন এসেছে গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে। বাংলাদেশে এই গ্রেগরীয় বর্ষ পঞ্জি অনুসারে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল শুভ নববর্ষ পালন করা হয়।

১৯৮৯ সাল থেকেই মঙ্গল-শোভাযাত্রা বাঙ্গালির নববর্ষ উদযাপনের একটি প্রধান আকর্ষন। উল্লেখ্য যে, ২০১৬ সালে ইউনেস্কো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর চারুকলা অনুষদ থেকে আয়োজিত যে মঙ্গল-শোভাযাত্রার বের করে, সেটিকে “মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য” হিসেবে ঘোষাণা করে। বাংলাদেশে নববর্ষ ১৪ এপ্রিল পালিত হলেও পশ্চিম বঙ্গে তা ১৫ এপ্রিল পালন করা হয়।

আরো পড়ুন: বাংলা নববর্ষ মুসলমানদের জন্য পালন করা কি জায়েজ?

কারণ, ভারতে হিন্দু সম্প্রদায় তিথি পঞ্জিকা অনুসরণ করে থাকে। বাংলাদেশে আধুনিক বাংলা বর্ষ পঞ্জিকায় গ্রেগরীয় পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা একাডেমি কর্তৃক ১৪ এপ্রিল বাংলা বছরের প্রথম দিন নির্দিষ্ট করা হয়।

বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় নিয়ে বিবাদ

বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় নিয়ে দু’টি গোত্র লক্ষ্য করা যায়। কেউ বলে ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে বাংলা বছরের শুরু হয়, তাই শুভেচ্ছা তখনই দিতে হবে। আর অপর পক্ষ বলে ইংরেজি পঞ্জিকার ন্যায় রাত ১২টার পরেই পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে হয়। আসলে কোনটি সঠিক?

ভোরের আলো ফুটার আগে কি আমাদের দেশে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানো যাবে না? যেহেতু আধুনিক বাংলা পঞ্জিকা গ্রেগরীয় পঞ্জিকা অনুসরণ করে, তাই সে নিয়ম অনুযায়ী রাত ১২টার পরেই আমাদের নতুন বছর শুরু হয়ে যায়। তাই, আমাদের দেশে আমরা রাত ১২টার পরেই বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাতে পারি।

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস থেকে বর্ষ বরণের রীতি-নীতি 

সম্রাট আকবরের শাসনামল থেকে পহেলা বৈশাখের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও পরবর্তিতে বিভিন্ন বাঙ্গালি রীতি-নীতি আমাদের বর্ষ বরণে স্থান পেয়েছে। সেগুলোর কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো-

১) গ্রামীন রীতি-নীতি

গ্রামীন রীতি অনুসারে ভোর সকালে কৃষকেরা নতুন জামা গায়ে দিয়ে পরিবারের সাথে নানান পদের ভর্তা দিয়ে পান্তা ভাত, পিঠা-পুলি, মিষ্টি খেয়ে দিনটি সূচনা করে। তাছাড়া, কয়েকটি গ্রাম মিলে বৈশাখী মেলার আয়োজন করতো। সেখানে বিভিন্ন ব্যবসায়ীরাও তাদের পণ্য মেলায় উঠাতেন। কেউ মাছ, কেউ খেলনা, কেউবা শাড়ি-চুড়ি, চুলের ফিতা। ধারণা করা হয় আমাদের ইলিশ মাছ খাবার ঐতিহ্য এই মেলা থেকেই এসেছে।

আরো পড়ুন: পহেলা বৈশাখ একটি অনুচ্ছেদ লিখুন

২) রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ ও মঙ্গল-শোভাযাত্রা

প্রতি বছর রমনার বটমূলে ছায়ানটের গানের অনুষ্ঠান থাকে। সূর্য উঠার সাথে সাথে নতুন বছরের মঙ্গল কামনায় রমনার বটমূল গানে গানে মুখরিত হয়ে উঠে। সকলে মিলে একই সুরে গেয়ে ওঠে-“এসো, হে বৈশাখ এসো এসো”। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে গ্রামীন সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে বিভিন্ন মুখোশ ও মুর্তি বানিয়ে ঢাকার রাস্তায় শোভাযাত্রা করে বরণ করা হয় নতুন বছরকে। এই শোভাযাত্রায় অংশ নিতে পারে সকলেই।

৩) প্রাচীন বউমেলা ও ঘোড়ামেলা 

সোনারগাঁও এ ঈসা খাঁ এর আমলে বউমেলা হতো। সেখানে স্থানীয় বটতলায় কুমারী, নববধূ ও মায়েরা তাদের মনের ইচ্ছা পূরণে পূজা করতো। পাঁঠা বলি দেয়া হতো আগে। তবে এখন শান্তির বার্তার আশায় তারা দেবীর কাছে কবুতর বা পায়রা উড়িয়ে দেয়। এছাড়াও সোনারগাঁও এ ঘোড়ামেলারও প্রচলন ছিলো।

লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, আগে যামিনী সাধন নামের এক ব্যক্তি নববর্ষের দিন ঘোড়া চড়ে সবাইকে প্রসাদ দিত। তার মৃত্যুর পরে সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ বানানো হয় এবং পরবর্তীতে এটিকে কেন্দ্র করে মেলার আয়োজন হয়। আগে মাটির ঘোড়া রাখা হতো, এরপর থেকে মেলায় নাগর-দোলা, চরকা, ঘোড়ার আকারে ঘূর্ণী দোলনা রাখা হয়।

একাডেমিক শিক্ষা বিষয়ক লিখিত প্রশ্ন সমাধান পেতে ক্লিক করুন।

আর্টিকেলের শেষ কথাঃ বাংলা নববর্ষ ও বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য,বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখের প্রবর্তক কে

Leave a Comment