পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধর

পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধর

পাকিস্তান সৃষ্টি হয় দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে। এর ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ে উঠে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশ নিয়ে।

পাকিস্তান সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলাকে শোষণ করার নীতি গ্রহণ করে। যার ফলে তারা অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য সৃষ্টি করে। পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে থাকে।

বাঙালি জাতির উপর আধিপত্য বিস্তারকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সুকৌশলে পূর্ব বাংলার জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতি ধ্বংসের হীনচক্রান্তে লিপ্ত হয়। কিন্তু আত্মবিশ্বাসী বাঙালি জাতি সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও প্রতিবাদ গড়ে তোলে।

বাঙালিরা তাদের উপর নির্যাতন ও নিপীড়নকে কখনো সহজে মেনে নেয়নি। সাংস্কৃতিক বৈষম্যের উপর ভিত্তি করেই বাঙালি জাতি স্বাধীনতা সংগ্রামে অগ্রসর হয়।


সাংস্কৃতিক বৈষম্য : পাকিস্তানের দু’অঞ্চলের মধ্যে চিন্তা, চেতনা, আচার, আচরণ, ব্যবহার, পোশাক পরিচ্ছেদ, জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, আদর্শ প্রভৃতি ক্ষেত্রে ছিল চরম বৈপরীত্য। শুধুমাত্র ধর্মীয় দিকে ছিল মিল। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে ছিল ৫৬ শতাংশ।

যাদের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের মাত্র ৭.২% লোকের ভাষা উর্দুকে ৫৬% লোকের উপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে চাইল। বাঙালি৷ সংস্কৃতি মুছে ফেলতে হীনচক্রান্ত শুরু করে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। এ প্রক্রিয়া ছিল সাংস্কৃতিক বৈষম্য ।


সাংস্কৃতিক বৈষম্যের কারণ : পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব-পাকিস্তানের সংস্কৃতি, ভাষা, চিন্তাচেতনা ধ্বংস করার জন্য কতক ভিত্তিহীন যুক্তি উপস্থাপন করেন। যেমন-

১. ঐতিহাসিক কারণ : পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষাকে ইসলামি রূপ দেবার জন্য বিভিন্ন কূটকৌশল গ্রহণ করেন। ঐতিহ্য অনুসারে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানি রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

২. রাজনৈতিক ঐক্যসাধন : রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপনের জন্য বাংলা সংস্কৃতি ধ্বংসের চেষ্টা করেন।

৩. রাষ্ট্রের সকল স্তরে সহজ ভাষা প্রচলন : রাষ্ট্রের সকল স্তরে সহজ ও সর্বজনীন ভাষা সৃষ্টির লক্ষ্যে রোমান হরফে বাংলা ও উর্দু ভাষা প্রবর্তনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বিভিন্ন পদক্ষেপ :


১. বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দমন করা : ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে বাঙালিরা অধিকার সচেতন এবং স্বাধীনচেত৷ জাতি। এজন্য পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দুর্বল ও শোষণ করার জন্য সাংস্কৃতিক ধ্বংসের চক্রান্ত গ্রহণ করে। বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষা চালু করে পুরো বাঙালি জাতিকে মূর্খ করে রাখার ষড়যন্ত্র গ্রহণ করে। যা ছিল দমন করার অপকৌশল।

২. আরবি হরফে বাংলা লেখা : ১৯৪৭ সালে আরবি হরফে বাংলা লেখার যুক্তি হিসেবে বলা হয় যে, পাকিস্তানের ৯০ শতাংশ লোক বাংলা আরবি বুঝে। তাই আরবি হরফে বাংলা চালু হলে মানুষ পরস্পর বুঝবে এবং পাকিস্তানে ঐক্য সৃষ্টি হবে। যা ছিল একটি অপকৌশল মাত্র।

৩. রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বৈষম্য : পাকিস্তানিরা ছিল ইসলামি ঐতিহ্যে আর বাঙালিরা ছিল হিন্দু, বৌদ্ধ সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রভাবিত। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালি সংস্কৃতিকে হিন্দু সংস্কৃতি বলে মনে করতো। তারা ইসলামি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় বাঙালি সংস্কৃতি ধ্বংসে লিপ্ত হয়।

৪. বাংলা ভাষা সংস্কার করার পদক্ষেপ : পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষাকে ধ্বংসের চক্রান্ত শুরু করে। তাছাড়া বংলা বর্ণমালার কতিপয় সংস্কৃত বর্ণ রয়েছে সেগুলো হিন্দুরা ব্যবহার করে। এজন্য বাংলাকে সংস্কৃতিমুক্ত করতে বর্ণমালা সংস্কারের পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং ধাপে ধাপে বাঙালি জাতির সংস্কৃতি ধ্বংসের চক্রান্তে লিপ্ত হয়।

পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক বৈষম্য ও এর প্রতিক্রিয়াগুলো আলোচনা ক

৫. বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পদক্ষেপ : পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন হলে সর্বপ্রথম আঘাত আসে বাংলা ভাষার উপর তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ইসলামি রাষ্ট্রের পবিত্রতা রক্ষার্থে উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষারূপে প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে ও রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। শাসক শ্রেণির এ পদক্ষেপে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-জনতা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার ফলে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় অনেকে। অবশেষ ১৯৫৬ সালে বাংলা দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলেও এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকে।


৬. শিক্ষা সংকোচন নীতি : আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ১৯৫৮
সালে ডিসেম্বর মাসে পশ্চিম পাকিস্তানের শিক্ষাসচিব এস. এম শরীফের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। শিক্ষা সংকোচন নীতিতে বলা হয় প্রতিটি স্কুলের ৬০ শতাংশ অর্থ সংগৃহীত হবে ছাত্র বেতন থেকে ২০ শতাংশ অর্থ ব্যবস্থপনা কর্তৃপক্ষ নির্বাহ করবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও সরকার এ নীতি অনুসরণ করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব বাংলার শিক্ষা বিস্তারকে স্থবির করে রাখা।


৭. প্রকাশনার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি : আইয়ুব খানের শাসনামলে বিভিন্ন প্রকাশনার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ১৯৬৬ সালে সরকার বিরোধী প্রচারণার জন্য ইত্তেফাকসহ পত্রিকা প্রকাশনী নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এছাড়া বিভিন্ন পুস্তক বাজেয়াপ্ত করা হয় । চলচ্চিত্র, নাটক প্রভৃতির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। যা বাঙালি সংস্কৃতির উপর হীনচক্রান্ত ছিল।

পূর্ব বাংলার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্যের চিত্র ও প্রতিক্রিয়া বর্ণনা কর

৮. রবীন্দ্রবিদ্বেষী মনোভাব : পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রবীন্দ্র রচনাবলি, গান, নাটক প্রভৃতির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলায় অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ে তোলার পিছনে রবীন্দ্রনাথের উৎসাহ বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করেছে বলে মনে করতো। পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক সরকার তাই রবীন্দ্রনাথ রচনাবলির প্রতি
রুষ্টভাব পোষণ করে। ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রসংগীত বেতার ও টেলিভিশনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা এবং নববর্ষ উদযাপন নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।


সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালি প্রতিক্রিয়া : পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালি সংস্কৃতি ধ্বংসের জন্য যে সকল অপচেষ্টা গ্রহণ করে তার বিরুদ্ধে বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে। সরকারের এরূপ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাঙালি সর্বদা সচেতন ও সক্রিয় ছিল। নিচে তা আলোচনা করা হলো :


১. সাংস্কৃতির সংগঠনের জন্ম ও প্রতিক্রিয়া : পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর স্বৈরাচারী ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্ন সংগঠন জন্ম নেয় এবং তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। বাঙালি জাতি তাদের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অযোচিত হস্তক্ষেপ কখনো নীরবে সহ্য করে নি।

বিভিন্ন ছাত্রসমাজ, পেশাজীবী সংগঠন তথা সর্বস্তরের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংস্কৃতি রক্ষায় জাগ্রত ভূমিকা রাখে। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস গঠিত হয়। এছাড়া ছাত্রসংগ্রাম কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদ, চট্টগ্রামের প্রান্তিক নামে সংগঠন বাঙালি ভাষা ও সাহিত্য রক্ষায় অগ্রণী৷ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া কুমিল্লা প্রভাতি মুসলিম ও ছায়ানট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল ।

২. ভাষা আন্দোলন : সাংস্কৃতিক বৈষম্যের ফলে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে ভাষা আন্দোলন। বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার হীন চক্রান্তে পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিবাদের ঝড় উঠে।

অবশেষে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন পাকিস্তান বিরোধী সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে পরিণত হয়। ভাষা আন্দোলন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শক্তির বিরুদ্ধে প্রথম বিজয়।

প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্যের চিত্র ও প্রতিক্রিয়া বর্ণনা কর

৩. বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিক্রিয়া : বাঙালিদের অধিকার আদায়ে ছাত্র সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ আরো কিছু ছাত্র সংগঠন বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা রাখে এ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বাংলা ভাষাকে প্রথম হিসেবে ইশতেহার ঘোষণা করে। এছাড়া ১৯৬২ সালে শিক্ষানীতি ও ১৯৬৮ সালের ছাত্র সংগঠনগুলো একত্রিত হয়ে গঠন করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।

ছাত্রদের ১১ দফা দাবি নিয়ে পূর্ব বাংলার শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নির্যাতনের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে।

৪. বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়া : বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষায় বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা ছিল সোচ্চার।

বাংলার স্থলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা এবং ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ হলে পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ প্রগতিশীল মহল।

৫. বাঙালি জাতীয়তাবাদের উৎপত্তি : বাঙালি জাতীয়তাবাদ সৃষ্টি হয় ভাষাকে কেন্দ্র করে।

ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ সৃষ্টি হয় তার উপর ভিত্তি করে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা যুদ্ধে লিপ্ত হয়। সাংস্কৃতিক বৈষম্যের কারণেই প্রথমে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়।

পশ্চিম পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধর

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলাকে শোষণ ও নির্যাতনের মাধ্যমে দমিয়ে রাখার যে অপচেষ্টা গ্রহণ করে তা অবশেষে ব্যর্থতায় পরিণত হয়।

বাঙালি জাতি তাদের সংস্কৃতি রক্ষার্থে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে যে আন্দোলন গড়ে তোলে তা মহীরুহে পরিণত হয় ১৯৭১ সালে।

শোষণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে পূর্ব বাংলা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় লাভ করে। যাত্রা শুরু হয় একটি শোষণ ও বৈষম্যহীন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।

আর্টিকেলের শেষ কথাঃ পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধর

Leave a Comment