সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা কী? সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা বলতে কি বুঝ

Google Adsense Ads

সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা কী?,সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা বলতে কি বুঝ

প্রকৃতিকে জয় করে, বশীভূত করে প্রকৃতির প্রভু হয়ে মানুষ কৃত্রিমভাবে যে জীবনযাপন করে— সেটাই তার সংস্কৃতি ও সভ্যতা। এদেশের মানুষ কখনো স্বকীয় মেজাজে আত্মবিকাশের সহজ ও স্বাভাবিক পথ পায়নি ।

প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে যেসব বণিক, পর্যটক, ধর্মপ্রচারক বাংলাদেশে এসেছে, তারা বাঁঙালিকে ভীরু, মিথ্যাভাষী, প্রতারক, কলহপ্রিয়, দরিদ্র ও চোর বলে জেনেছে । মূলত সংস্কৃতি বহতা নদীর মতো প্রবহমান ও গতিশীল । তাই সংস্কৃতির এ সচল প্রবাহই বাঙালি সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতার পেছনে দায়ী ।

বাঙালি সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা যেভাবে ঘটে : বাঙালি সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা যেভাবে ঘটে তা নিম্নে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো :

১. আর্য-সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ : আর্য বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গেই এদেশের উচ্চবিত্তের ও আভিজাত্যের লোকগুলো আর্য সমাজে মিশে গিয়েছিল । আর্যদের বসবাসের সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর ভারত ‘আর্যাবর্তে’ পরিণত হয়।

আর্যরা বহুকাল ধরে এ দেশে প্রবল প্রতাপের সঙ্গে শাসনকার্য চালায় । ফলে তাদের সংস্কৃতির সাথে দেশীয় সংস্কৃতির সংমিশ্রণে নতুন এক সংস্কৃতির সৃষ্টি হয় ।

২. অস্ট্রিক মঙ্গোলদের সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ : অস্ট্রিক মঙ্গোলদের নিজস্ব একটা সংস্কৃতি আছে— সেটাই চিরকাল বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির ধারা । তার প্রভাব থেকে বাঙালি কখনো মুক্ত হতে পারবে না। বাঙালির চেতনায়, স্নায়ুতে, রক্তধারায় তা মিশে আছে যুগ যুগ ধরে। সাংখ্য, যোগ, তন্ত্র, দেহতন্ত্র এগুলো হচ্ছে বাংলার আদি মঙ্গোলদের দান ।

আর নারী দেবতা, পশুপাখি ও বৃক্ষদেবতা, জন্মান্তরবাদ প্রভৃতি হচ্ছে অস্ট্রিকদের দান । এ সকল বৈশিষ্ট্য বাঙালির চরিত্রে ও জীবনে অন্তর্নিহিত ।

বাঙালি বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ, ইসলাম প্রভৃতি ধর্ম গ্রহণ করে নানা সম্প্রদায়ের রূপ লাভ করেছে বটে, কিন্তু কখনো সে সাংখ্য, যোগ ও তন্ত্রের প্রভাব ত্যাগ করতে পারেনি । ফলে বহিরাগত প্রতিটি মতবাদ এখানে এসে নতুন রূপ লাভ করেছে, নতুন চরিত্র নিয়েছে, বাঙালি রূপ নিয়েছে ।

সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা বলতে কি বুঝ

৩. বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের অনুপ্রবেশ : আর্য-অনার্যের বিভেদ যখন ঘুচে যায়, তখন দেশ বা মানুষের কাছে বুদ্ধ মহাবীরের বাণী পৌছে দেবার পক্ষে কোনো বাধা থাকে না । এ সময়েই প্রথম জৈন ও বৌদ্ধ ভিক্ষুকগণ মগধের সীমা অতিক্রম করে আধুনিক বাংলাদেশে নবধর্ম প্রচারের জন্য উপস্থিত হন।

এদেশের বর্বর প্রায় জনগণের মধ্যে আর্যভাষা ও সংস্কৃতির আবরণে এই দ্রোহী ধর্ম অর্থাৎ জৈন— বৌদ্ধ মতবাদ প্রচারিত হয়। এদের লিপি ছিল না, সাহিত্যের শালীন ভাষা ছিল না, উঁচুমানের সংস্কৃতি ছিল না ।

তাই আর্য ধর্মের সাথে আর্যভাষা, সংস্কৃতি তাদের বরণ করে নিতে হয় । বাংলার পাল রাজাগণ বৌদ্ধ ছিলেন । তাই তাদের সময়ে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধধর্ম টিকেছিল । সেন রাজাগণ ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী ছিলেন।

বাঙালি সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা

৪. বিদেশি শাসন : বাঙালিরা চিরকালই বিদেশি ও বিজাতি শাসিত জাতি । সপ্তম শতকের শশাঙ্ক-নরেন্দ্র গুপ্ত এবং পনেরো শতকের যদু-জালালুদ্দিন ছাড়া বাংলার কোনো শাসকই বাঙালি ছিলেন না।

এটি নিশ্চিতই লজ্জার এবং বাঙালি চরিত্রে নিহিত রয়েছে এর গূঢ় কারণ । দীর্ঘকাল বিদেশিদের দ্বারা শাসিত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই শাসক শ্রেণীর সংস্কৃতির অবাধ অনুপ্রবেশ যে আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

৫. ইসলাম ধর্মের অনুপ্রবেশ : উপমহাদেশে তুর্কি বিজয়ের সাথে সাথে ইসলাম ধর্মের প্রবেশ ঘটে ব্যাপকভাবে । যদিও অতীতে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মুসলিম বণিক বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এদেশে গমন করেছিল কিন্তু চূড়ান্তভাবে এদেশে ইসলাম প্রবেশ করে তুর্কি বিজয়ের পরে ।

এরপর আফগান ও মুঘল শাসনামলে এবং আরব-ইরানি ও মধ্য এশীয় বহু উপজাতির প্রভাবে সুদীর্ঘ প্রায় ৭০০ বছর মুসলমানরা এ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছিল। মুসলমানদের এই দীর্ঘ শাসনের ফলে জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এসেছে নানা পরিবর্তন

সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা ও ধর্মীয় সহনশীলতা সম্পর্কে আলোচনা কর

৬. নতুন নতুন ধর্মমতের প্রচলন : বাঙালির ধর্মচিন্তাকে প্রভাবিত করেছে লৌকিক ধর্ম, জৈনধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, হিন্দুধর্ম, নাথধর্ম, ইসলাম ধর্ম প্রভৃতি। বাঙালির এ সকল ধর্মচিন্তাও সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে । যে কারণে সম্রাট আকবর উপমহাদেশের প্রধান প্রধান ধর্মের সমন্বয়ে গড়ে তোলেন নতুন এক ধর্মমত যা দ্বীন-ই-ইলাহী নামে পরিচিত ।

Google Adsense Ads

৭. বিদেশি পর্যটক ও পরিব্রাজকের আগমন : অতীতে ধর্মপ্রচারক, পরিব্রাজুক এবং পণ্ডিতগণ বিভিন্ন দেশে গমনাগমনের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং আদান-প্রদানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন ।

আমাদের এ অঞ্চলে চীনের হিউয়েন সাং, মরক্কোর ইবনে বতুতা, ইতালির মার্কো পোলো প্রমুখ বিদেশি পর্যটক তথা পরিব্রাজকের আগমনও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধনের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

৮. বাঙালির দর্শন : আবহমান বাংলার সংস্কৃতি, কৃষ্টি, চিন্তা-চেতনা, মনন-সাধনা ও ধর্ম এসব মিলিয়েই গড়ে উঠেছে বাঙালির দর্শন । রাঙালির উল্লেখযোগ্য দর্শসনমূহ হলো লোকায়ত দর্শন, বৈষ্ণৱ দৰ্শন, সুফি দর্শন, বাউল দর্শন, চার্বাক দর্শন প্রভৃতি ।

যা মূলত প্রকাশ পেয়েছে মানবতাবাদ ও ভক্তিবাদের মধ্য দিয়ে । বাঙালির সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতার ক্ষেত্রে এটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ।

সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা কি

৯. ব্যবসা-বাণিজ্য : ব্যবসা-বাণিজ্য উপলক্ষে বাঙালিদের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গমন এবং সেখানকার বণিকদের এদেশে আগমন ছিল নিয়মিত ব্যাপার । তাই ক্রিটবাসীর সঙ্গে প্রাচীন বাঙালির সংস্কৃতির যোগও ছিল স্বাভাবিক ।

এর প্রমাণও মেলে, ক্রিটে প্রচলিত লিপির সঙ্গে বাংলার ‘পাঞ্চ মার্কযুক্ত’ মুদ্রায় উৎকীর্ণ লিপির সাদৃশ্য থেকে ।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা যে সংস্কৃতি বহন করছি তা আমরা বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মাধ্যমে পেয়েছি । বস্তুত, বিভিন্ন শাসক, পরিব্রাজক, ব্যবসায়ী, ধর্মীয় নেতা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষাপট থেকেই আমরা বাঙালি সংস্কৃতি পেয়েছি । আর এভাবেই বিভিন্ন অনুঘটক-ঘটকের মাধ্যমেই বাঙালি সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা ঘটেছে ।

আর্টিকেলের শেষ কথাঃ সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা কী?,সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতা বলতে কি বুঝ

Google Adsense Ads

Leave a Comment