লর্ড ডালহৌসি রাজ্য বিস্তার নীতি পর্যালোচনা কর,লর্ড ডালহৌসির সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি

লর্ড ডালহৌসি রাজ্য বিস্তার নীতি পর্যালোচনা কর,লর্ড ডালহৌসির সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি


ভূমিকা : ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। প্রথমে কোম্পানি বাণিজ্য করার জন্য ভারতে আসলেও পরে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করেছিল। ফলে ভারতবর্ষে শাসন ক্ষেত্রে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়। কোম্পানির শাসনকার্য পরিচালনা করার জন্য বা ভারতীয় শাসন ক্ষেত্রে কোম্পানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক প্রতিনিধি বা গভর্নর জেনারেলের আবির্ভাব হয়েছিল। এদের অনেকের অনেক রকমের উদ্দেশ্য ছিল। তবে কোম্পানি তথা ব্রিটিশ স্বার্থরক্ষা করা ছিল তাদের মুখ্য দায়িত্ব। এ নিয়মেই কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে ১৮৪৮ সালে লর্ড ডালহৌসির আবির্ভাব ভারতে হয়েছিল। ডালহৌসি ছিলেন ঘোর সাম্রাজ্যবাদী। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার সাধন করা ছিল তাঁর অন্যতম নীতি । এ নীতিকে সফল করার জন্য তিনি যে কোন পন্থা অবলম্বন করতে দ্বিধা করেন নি। তাই রাজ্যবিস্তারের ক্ষেত্রে তিনি স্বত্ব বিলোপ নীতিকে প্রয়োগ করেন ও কিছুটা সফল হন।

ডালহৌসির প্রাথমিক পরিচয় : ১৮৪৮ সালে লর্ড ডালহৌসি যখন ভারতবর্ষে গভর্নর জেনারেল হয়ে আসেন তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৬ বছর। ভারতে আসার আগে তিনি ইংল্যান্ডের বোর্ড অব ট্রেডের সহ-সভাপতি হিসেবে প্রশাসনিক কাজে খ্যাতি লাভ করেন। তিনি ছিলেন স্কটল্যান্ডের এক অভিজাত পরিবারের সন্তান। স্কচ জাতির স্বভাব সুলভ বাস্তবতা বোধের সাথে তিনি তাঁর অভিজাত সুলভ ঔদ্ধত্যকে যুক্ত করে তাঁর ব্যক্তিত্বকে বৈশিষ্ট্য দেন। তিনি যে নীতি গ্রহণ করেন তা কার্যকরী করার জন্য তিনি অপরিসীম উদ্যম ও কঠোর পরিশ্রম করতে পারতেন। তাঁর মেজাজ ছিল ঔদ্ধত্যপূর্ণ। কোন কিছুকে তোয়াক্কা না করে চলা তাঁর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ছিল। তাই তিনি ভারতবর্ষে এ সাম্রাজ্য বিস্তারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে উদ্যোগী হন ।

ডালহৌসির রাজ্যবিস্তার নীতি : ভারতবাসী ও ভারতীয় সভ্যতা সম্পর্কে লর্ড ডালহৌসি একটি তাচ্ছিল্যপূর্ণ অনুকম্পাবোধ নিয়ে এদেশে আসেন। ডালহৌসি বিশ্বাস করতেন যে, ভারতবাসীর মঙ্গলের জন্য এদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রয়োজন। ভারতীয় রাজাদের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর চরম অশ্রদ্ধা ছিল। তিনি মনে করতেন যে, ভারতীয় রাজাদের শাসনব্যবস্থা ছিল ঘোরতর দুর্নীতিপূর্ণ ও অত্যাচারী। এ ব্যবস্থাকে লোপ করে ব্রিটিশ শাসন বা Pax Britannica-এর বিস্তার ভারতবাসীর পক্ষে মঙ্গলজনক হবে। তবে ভারতবাসী তাঁর পরিকল্পনাকে সমর্থন করবে কিনা এধরনের চিন্তা চেতনা তাঁর ছিল না। তাঁর নীতি ছিল পূর্ববর্তী গভর্নরদের চেয়ে ব্যতিক্রমধর্মী। তাঁর নীতি ছিল আইন বাঁচিয়ে যতদূর সম্ভব রাজ্য অধিগ্রহণ করা। ডালহৌসি একটি পত্রে তাঁর নীতি ব্যাখ্যা করে বলেন : আমার মতে, কোম্পানির পক্ষে বিজ্ঞ ও সুচিন্তিত নীতি এটা হওয়া উচিত যে, দেশীয় রাজ্য অধিগ্রহণ বা রাজস্ব অধিগ্রহণের ন্যায় সুযোগ পেলে তা প্রত্যাখ্যান বা অবহেলা না করা। ডালহৌসি তাঁর রাজ্যগ্রহণ নীতির সমর্থনে দুটি উদ্দেশ্যের কথা বলেছে ।

যথা : ১. দেশীয় রাজ্যগুলোকে ব্রিটিশের প্রত্যক্ষ শাসনে এনে পাশ্চাত্য ভাবধারার শাসন ও সংস্কার প্রবর্তন দ্বারা ভারতবাসীর কল্যাণ সাধন করা, ২. তিনি তাঁর রাজ্যগ্রহণ নীতির দ্বিতীয় লক্ষ্যে বলেন যে, ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সংহতি রক্ষাকে গ্রহণ করেন এবং ভারতের ব্রিটিশ পণ্যের বাজার দখল করা। স্যার উইলিয়াম লী ওয়ার্নার দেশীয় রাজ্যগুলো সম্পর্কে কোম্পানির নীতিকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। যথাঃ

১. বেড়াজাল নীতি : এ নীতি অনুসারে দেশীয় রাজ্যগুলোকে বৈদেশিক রাজ্য মনে করে কোম্পানির অধিকৃত অঞ্চল বা ব্রিটিশ শাসিত ভারত দ্বারা এ রাজ্যগুলোকে যতদূর সম্ভব বেষ্টন করা। এর সাথে দেশীয় রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ শাসনে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকা। লর্ড হেস্টিংসের আগপান্ত এ নীতি অনুসৃত হয়।

২. অধীনস্থ মিত্রতা ও দূরত্ব নীতি : এ পর্যায়ে দেশীয় রাজ্যগুলোকে কোম্পানির বশ্যতা মানতে বাধ্য করা এবং তাদের অন্য কোন বৈদেশিক শক্তির সাথে মিত্রতা স্থাপন থেকে দূরে রাখা। এদেশীয় রাজ্য কোন আক্রমণের সম্মুখীন হলে সে আক্রমণ থেকে তাদের রক্ষা করা। এ রাজ্যগুলোর স্বায়ত্তশাসনের অধিকার রক্ষা করা। এ নীতি অনুসারে কোম্পানি মুঘল বাদশাহের মত ভারতের সার্বভৌম অধিরাজত্ব বা প্যারামাউন্টসির দাবি করেন। লর্ড হেস্টিংস থেকে লর্ড ডালহৌসির ভারতের আগমন কাল পর্যন্ত এ নীতি অনুসৃত হয় ।

৩. অধীনস্থ রাজ্যগুলোর সরাসরি কোম্পানির দ্বারা অধিগ্রহণ নীতি : ডালহৌসি এ নীতি চালু করেন। ডালহৌসি দেশীয় রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসনের অধিকার স্বীকার করতেন না। তাঁর মতে, এর ফলে কুশাসন দেখা দেয় । দেশীয় রাজ্যগুলোকে কোম্পানির দ্বারা অধিগ্রহণ করাই তিনি ন্যায্য কাজ বলে মনে করেন। তাই ডালহৌসি ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য চারটি পন্থা অবলম্বন করেন। এ চারটি পন্থা হল :

ক. প্রত্যক্ষ যুদ্ধের দ্বারা রাজ্য অধিগ্রহণ। গ. স্বত্ব বিলোপ নীতির প্রয়োগ দ্বারা দেশীয় রাজ্য অধিগ্রহণ। স্বত্ব বিলোপ নীতির প্রয়োগ দ্বারা ভাতা প্রদান বন্ধ করা ও খেতাব গ্রহণ লোপ করা।

ঘ. কুশাসনের অজুহাতে মিত্ররাজ্য অধিগ্রহণ ।

স্বত্ব বিলোপ নীতির প্রকৃতি ঃ ডালহৌসির সাম্রাজ্য বিস্তারের অন্যতম অস্ত্র হল স্বত্ব বিলোপ নীতি। এ নীতির মূলকথা ছিল এই যে, ব্রিটিশের অনুগ্রহ ও প্রশ্রয়ে থাকা দেশীয় রাজবংশের কোন উত্তরাধিকারী না থাকলে রাজ্যগুলো প্রত্যক্ষভাবে ব্রিটিশের সাম্রাজ্যভুক্ত হয়ে পড়বে।

দত্তক পুত্রের উত্তরাধিকার ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক স্বীকৃত হবে না। এমনকি এ যাবত দত্তক পুত্র গ্রহণের ব্যাপারে বিশেষ অনুমতি দানের যে ব্যবস্থা ছিল তিনি তা বাতিল করেন। অবশ্য ডালহৌসি এটা ঘোষণা করেন যে, ব্রিটিশের আশ্রিত মিত্র রাজ্যের প্রতি এ নীতি প্রয়োগ করা হবে না। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ডালহৌসি কর্তৃক এ কুখ্যাত নীতি উদ্ভাবিত হয় নি, তবে তিনি এ নীতির সার্থক প্রয়োগ করে এ কুখ্যাত নীতির সাথে তাঁর নাম জড়িত করেন।

এ নীতি প্রয়োগ করে তিনি অনেক রাজ্য অধিগ্রহণ করেন। লর্ড ডালহৌসির মতে, ভারতে তখন তিন শ্রেণীর রাজ্য ছিল।

যথা ঃ যে সকল দেশীয় রাজ্য অধিকারভুক্ত ছিল না এবং কোম্পানিকে কর দিত না ও বশ্যতা জানাত না । যে সকল দেশীয় রাজ্য কোম্পানির প্রতি বশ্যতা জানত বা কর প্রদান করত। যে সকল দেশীয় রাজ্য বা রাজবংশ কোম্পানির দ্বারা স্থাপিত হয়েছিল এবং কোম্পানির উপর নির্ভরশীল ছিল। ডালহৌসি তাঁর স্বত্ব বিলোপ নীতির দ্বারা ঘোষণা করেন যে, প্রথম শ্রেণীর রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রে এ নীতি প্রয়োগ হবে না। দ্বিতীয় শ্রেণী তথা যে রাজ্যগুলো ব্রিটিশের আশ্রিত ছিল সে রাজ্যের ক্ষেত্রে এ নীতি প্রয়োগ করা হল। তৃতীয় শ্রেণীর রাজ্য, যথা ঃ

যে রাজ্য ব্রিটিশের দ্বারা সৃষ্ট এবং ব্রিটিশের উপর নির্ভরশীল ছিল তাদের ক্ষেত্রে কোন রাজার পুত্র বা উত্তরাধিকারী না থাকলে সে রাজাকে দত্তক গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হবে না। সে সকল রাজ্য রাজার মৃত্যুর পর কোম্পানিতে বর্তাবে। ডালহৌসি ঘোষণা দেন, কেবলমাত্র আশ্রিত বা নির্ভরশীল রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রেই এ নীতি প্রযুক্ত হবে। যে রাজ্য কোম্পানির আশ্রিত ও কোম্পানির উপর নির্ভরশীল এবং যে রাজ্য কোম্পানির দ্বারা সৃষ্ট সে রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রেই একমাত্র এ আইন প্রযুক্ত হবে ।

স্বত্ব বিলোপ নীতির ত্রুটি : ডালহৌসির নীতি ছিল কুটিলতাপূর্ণ ও নিষ্ঠুর। নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা করা হল : প্রথমত, কোন্ রাজ্য কোম্পানির উপর নির্ভরশীল এবং কোন্ রাজ্য কোম্পানির আশ্রিত তা স্থির করা কঠিন ছিল। এ উভয় শ্রেণীর রাজ্যের শ্রেণীবিভেদের সীমারেখা ছিল সূক্ষ্ম ।

দ্বিতীয়ত, লর্ড ডালহৌসি নিজেই এ ভেদাভেদ মান্য করেন নি। তিনি নির্বিচারে নির্ভরশীল ও আশ্রিত উভয় প্রকার রাজ্যের ক্ষেত্রে স্বত্ব বিলোপ আইন প্রয়োগ করেন। পরবর্তীকালে কোন কোন রাজ্যের ক্ষেত্রে লর্ড ডালহৌসির সিদ্ধান্ত অন্যায় প্রমাণিত হয়। পরিচালক সভার নির্দেশে সে সকল রাজ্য উত্তরাধিকারীকে ফেরৎ দেওয়া হয় ।

তৃতীয়ত, ডালহৌসি নিজেই বলেছিলেন যে, দেশীয় রাজ্য অধিগ্রহণের ন্যায্য সুযোগ পেলে কোম্পানির তা অবহেলা করা উচিত নয়। সুতরাং, লর্ড ডালহৌসি যে কোন উপায়ে দেশীয় রাজ্য অধিগ্রহণের চেষ্টা করবেন, এ র ম ধারণা দেশীয় রাজাদের মনে দেখা দেয়। স্বত্ব বিলোপ নীতি দেশীয় রাজ্যগুলো দখলের জন্য একটি অজুহাত বলে অনেকে মনে করেন।

চতুর্থত, অপুত্রক ব্যক্তির দত্তক পুত্র গ্রহণ ছিল হিন্দু সমাজের একটি প্রাচীন রীতি। সুতরাং, ডালহৌসি এ অধিকার ও রীতিকে নস্যাৎ করায় দেশীয় রাজা, জনসাধারণ অসন্তুষ্ট হন। এসব সাম্রাজ্যবাদী নীতি ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে দেশীয় রাজা ও জনসাধারণের যোগদানের একটি বড় কারণ ছিল।
পঞ্চদশ, দেশীয় রাজ্যগুলো অধিগ্রহণ করায় বহু দেশীয় রাজ্যের কর্মচারী ও সৈনিক চাকরি হারায়। এ সকল ব্যক্তির পরিবারবর্গ নিরাশ্রয় হয়ে কোম্পানির বিরুদ্ধে মহাবিদ্রোহে যোগ দেয় । ষষ্ঠত, ডালহৌসি স্বত্ব বিলোপ নীতিকে নির্বিচারে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করেন। এমনকি যে সকল দেশীয় রাজা রাজ্যের বিনিময়ে কোম্পানির ভাতা ভোগ করতেন তাদেরও দত্তক গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।

সপ্তমত, ডালহৌসির পক্ষে বলা চলে যে, স্বত্ব বিলোপ আইন কোন নতুন আইন ছিল না। ডালহৌসির আগে সীমিত ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করা হয়েছিল। ১৮৩৪ সালে পরিচালক সভা এ আইনের কথা ভাবেন । অষ্টমত, ডালহৌসির যুক্তি ছিল যে, তিনি এসকল রাজ্যের প্রজাকে কুশাসন থেকে রক্ষা করেছেন । এ যুক্তিও ছিল ত্রুটিপূর্ণ।
স্বত্ব বিলোপ নীতি প্রয়োগ ঃ লর্ড ডালহৌসি স্বত্ব বিলোপ নীতি প্রয়োগ করে নিম্নলিখিত রাজ্যগুলো অধিগ্রহণ করেন ?

১. সাঁতারা রাজ্য : ১৮১৮ সালে লর্ড হেস্টিংস মারাঠাদের পতনের পর মারাঠা রাজ্যের একাংশ নিয়ে এ রাজ্য গঠন করেন। শিবাজীর এক বংশধরকে তিনি সিংহাসনে বসান। এ রাজার পুত্র না থাকায় কোম্পানির অনুমতি ছাড়া তিনি এক দত্তক পুত্র নেন। ডালহৌসি এ ব্যবস্থা নাকচ করে সাঁতারার রাজার মৃত্যু হলে স্বত্ব বিলোপ নীতি প্রয়োগ করে সাঁতারা রাজ্য অধিগ্রহণ করেন। ডালহৌসির একাজের জন্য মারাঠারা অসন্তুষ্ট হন।

২. নাগপুর রাজ্য : নাগপুরের ভোঁসলে রাজার অপুত্রক অবস্থায় মৃত্যু হলে ডালহৌসি নাগপুর রাজ্য স্বত্ব বিলোপ নীতি অনুযায়ী অধিগ্রহণ করেন। ১৮১৮ সালে লর্ড হেস্টিংস ভোঁসলে রাজার সাথে বশ্যতা মূলক সন্ধি করেন। এ অজুহাতে ডালহৌসি দাবি করেন যে, নাগপুর ছিল কোম্পানির আশ্রিত রাজ্য। ডালহৌসির এ দাবি সম্পর্কে সন্দেহ ছিল। কারণ, ভোঁসলের রাজ্য ব্রিটিশের সাথে চুক্তির আগেও ছিল। তাছাড়া ভোঁসলের পরিবারবর্গের প্রতি ইংরেজ সেনারা দুর্ব্যবহার করে তাদের সম্পত্তি, অর্থ ও অলঙ্কার লুন্ঠন করেন। রাজপরিবারের আসবাবপত্র প্রকাশ্য নিলামে বিক্রি হয়। আসলে ডালহৌসি কলকাতাকে বোম্বাইয়ের সাথে স্থলপথে কোম্পানির শাসিত রাজ্যের দ্বারা যুক্ত করার উদ্দেশ্যে মধ্যবর্তী রাজ্য নাগপুর অধিকার করেন।

৩. সম্বলপুর অধিকার ঃ ১৮৫০ সালে ডালহৌসি সম্বলপুর রাজ্যটি অধিগ্রহণ করেন।

৪. ঝাঁসি অধিকার : একই বছরে ডালহৌসি উত্তর প্রদেশের অন্তর্গত ঝাঁসি রাজ্য অধিগ্রহণ করেন। মৃত রাজার বিধবা স্ত্রী রাণী লক্ষ্মীবাঈ দত্তক পুত্র গ্রহণ করলে ডালহৌসি তা স্বীকার করেন নি। লক্ষ্মীবাঈ ১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন ।

৫. উদয়পুর, কৌরলী, ভগৎ ও জৈৎপুর অধিকার : ডালহৌসি উদয়পুর, কৌরলী, ভগৎ, জৈৎপুর প্রভৃতি রাজ্য তিনি অধিগ্রহণ করেন। পরে গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং ভগৎ ও উদয়পুর রাজ্য উত্তরাধিকারীদের ফেরত দেন। পরিচালক সভার নির্দেশে কৌরলী রাজ্যও ফেরত দেওয়া হয় ।

৬. ভাতা ও খেতাবের স্বত্বলোপ : ডালহৌসি ভাতা ও খেতাবের ক্ষেত্রেও স্বত্ব বিলোপ নীতি প্রয়োগ করেন। ১৮৫১ খ্রিঃ পেশবা দ্বিতীয় বাজীরাও এর মৃত্যু হলে তাঁর দত্তক পুত্র নানা ধন্দুপন্থ তাঁর পিতাকে বছরে যে ৮ লক্ষ টাকা ভাতা দেওয়া হতো তা দাবি করেন। ডালহৌসি এ দাবি নাকচ করে নানার ভাতা রদ করেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, এ ভাতা, ছিল দ্বিতীয় বাজীরাও এর ব্যক্তিগত ভাতা। যদিও পেশবার রাজ্য অধিগ্রহণ ও তার পদের বিলুপ্তির বিনিময়ে এ ভাতা দেওয়া হয় এবং ন্যায্যত তাঁর স্বীকৃত দত্তক পুত্রের তা প্রাপ্য ছিল। ডালহৌসি তা নস্যাৎ করে দেন। নানা বঞ্চনার প্রতিবাদে ১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহে প্রধান নেতৃত্ব দিয়ে কোম্পানির বহু ক্ষয়ক্ষতি করেন। এছাড়া ১৮৫৫ সালে কর্নাটের নবাবের মৃত্যু হলে তাঁর পদ ও ভাতা লোপ করা হয়। তাঁর উত্তরাধিকারীকে স্বত্ব বিলোপ আইন অনুযায়ী বঞ্চিত করা হয়। তিনি ১৮৫৫ সালে তাঞ্জোরের রাজার মৃত্যু হলে তার দুই কন্যা সন্তান থাকলেও তাদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করেন। পরে তাঞ্জোরের রাজপদ ও ভাতা লোপ করেন। ডালহৌসি মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের খেতাব ও ১২ লক্ষ টাকা ভাতা লোপ করার চেষ্টা করেন। পরিচালক সভার বাধায় তিনি সফল হন নি ।

যুদ্ধের দ্বারা রাজ্যবিস্তার : ডালহৌসি তাঁর রাজ্যবিস্তার নীতিকে সফল করার জন্য প্রত্যক্ষ যুদ্ধনীতি চালু করেন । ফলে যুদ্ধ ক্ষেত্রে তিনি জড়িয়ে পড়েন । যথা :

১. দ্বিতীয় শিখযুদ্ধ : প্রথমে যুদ্ধের সূচনা হয় মুলতানের শাসনকর্তার সাথে। মুলতানরাজের সাথে সংঘর্ষে ডালহৌসির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর ঝিলাম নদীর তীরে চিলিয়ানওয়ালায় শিখদের সাথে তাঁর এক ভীষণ যুদ্ধ হয় । যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে ডালহৌসি সফল না হলেও পরে শিখরা তাদের সাফল্য বজায় রাখতে পারেন নি। তারপর চীনাব নদীর তীরে গুজরাট নামক শহরের উপকণ্ঠে লর্ড গ্রাফ ও শিখদের মধ্যে যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে শিখগণ সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়ে আফগানিস্তানের দিকে পলায়ন করে। লর্ড গ্রাফ চিলিয়ান ওয়ালার যুদ্ধে পরাজয়ের অপমান গুজরাটের যুদ্ধে জয়লাভের দ্বারা দূর করলেন। পেশওয়ার দখল এবং শের সিং-এর আত্মসমর্পণে দ্বিতীয় শিখযুদ্ধের অবসান হয়। পরে লর্ড ডালহৌসি পাঞ্জাব অধিকার করেন।

২. দ্বিতীয় ইঙ্গ-ব্রহ্ম যুদ্ধ : প্রথম ব্রহ্ম যুদ্ধের পর ব্রহ্মদেশে একজন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট স্থাপনের ব্যবস্থা করেন। এ রেসিডেন্ট স্থাপনের ঘটনা নিয়ে দ্বিতীয় ব্রহ্ম যুদ্ধের সূচনা হয়। ১৮৫২ সালে ১৪ এপ্রিল রেঙ্গুন ব্রিটিশ বাহিনী কর্তৃক অধিকৃত হয়। সে বছরই অক্টোবর মাসে জেনারেল গডউইন প্রোম দখল করেন।

৩. সিকিম রাজ্যের একাংশ অধিকার । কোম্পানির সাম্রাজ্যের উত্তরে অবস্থিত নেপাল ও ভুটানের মধ্যবর্তী ক্ষুদ্র সিকিম রাজ্যের রাজা ১৮৪৯ সালে ডঃ ক্যাম্পবেল নামে জনৈক ইংরেজ কর্মচারী ও ডঃ হুকার নামে অপর একজন ইংরেজকে বন্দি করলে লর্ড ডালহৌসি সিকিম রাজ্যের এক ক্ষুদ্র অংশ অধিকার করে এর প্রতিশোধ গ্রহণ করেন।

কুশাসনের অজুহাতে রাজ্য অধিগ্রহণ ও অযোধ্যার নবাবের উপর ১৭৬৫ সাল থেকে বিভিন্ন সন্ধি কোন চাপিয়ে দেয়। অযোধ্যার অধীনতামূলক চুক্তির শর্ত হিসেবে ব্রিটিশ সেনাকে রেখে সেনাদলের খরচা বাবদ বহু অর্থ নিতে বাধ্য করেন। অযোধ্যা শাসনের দায়িত্ব নবাবের উপর থাকলেও কোম্পানির কর্মচারী ও ইংরেজ বণিকরা অযোধ্যার হ ক্ষেপ করত এবং অযোধ্যাকে শোষণ করত। কোম্পানির প্রাপ্য অর্থ আদায়ের জন্য নবাবকে প্রজাদের উপর জবরদস্তি করতে হতো। ডালহৌসির সময় অযোধ্যার কুশাসন সম্পর্কে রিপোর্ট দানের জন্য কর্নেল শ্রীম্যানকে নিয়োগ করেন। এ রিপোর্ট পাওয়ার পর তিনি অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলী শাহকে পদচ্যুত করে অযোধ্যা রাজ্য অধিগ্রহণ করেন। অযোধ্যা ছেড়ে কলকাতার খিদিরপুরে ১২ লক্ষ টাকা ভাতা নিয়ে বাস করতে বাধ্য করা হয়। তবে অনেকে ডালহৌসির অযোধ্যা গ্রহণ নীতিকে সমালোচনা করেন।

এর পর ডালহৌসি হায়দারাবাদের নিজামের প্রতি দৃষ্টি দেন। নিজাম তাঁর রাজ্যে যে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী ছিল তার খরচ দিতে অসমর্থ হওয়ায় ডালহৌসি বেরার প্রদেশ তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য করেন। পরে বেরার বোম্বাই প্রেসিডেন্সির সাথে যুক্ত হয়।

উপসংহার ঃ অতএব বলা যায়, লর্ড ডালহৌসি কোম্পানির প্রতিনিধিদের মধ্যে একজন ঘোর সাম্রাজ্যবাদী ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ তথা কোম্পানি স্বার্থরক্ষার জন্য যে নীতির প্রয়োগ করেন তা ধীকৃত হলেও কার্যকরী করেন। এছাড়া তিনি ছিলেন একজন ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তি। তাই স্বত্ব বিলোপ নীতি তাঁর নিজের উদ্ভাবিত না হলেও তিনি তার শাসনামলে এর প্রয়োগ কিংবা অপপ্রয়োগ করেন। অর্থাৎ যেখানেই তিনি সামান্য অজুহাত পান সেখানেই এর প্রয়োগ করেন। এজন্য তিনি ভারতীয় জনসাধারণের কাছে ঘৃণার পাত্র হন কিন্তু তাঁর কোন অসুবিধা হয় নি। তিনি সাম্রাজ্যবাদী লিলা দ্বারা ভারতের চির প্রচলিত আইনকানুন বা রীতিনীতি উপেক্ষা করে ভারতে কোম্পানি তথা ব্রিটিশ ভিত্তিকে মজবুত করার জন্য সচেষ্ট হন।

Leave a Comment