নারী নেতৃত্ব হিসেবে শেখ হাসিনার উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ড আলোচনা কর , বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী নেতৃত্ব হিসেবে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উন্নয়নে কী কী অবদান রেখেছেন আলোচনা কর

প্রশ্ন সমাধান: নারী নেতৃত্ব হিসেবে শেখ হাসিনার উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ড আলোচনা কর , বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী নেতৃত্ব হিসেবে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উন্নয়নে কী কী অবদান রেখেছেন আলোচনা কর

ভূমিকা : নেতৃত্ব হলো যেকোনো জাতির পথপ্রদর্শক। নেতৃত্ব ব্যতীত কোনো জাতিই সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারে না। যোগ্য নেতৃত্ব যেমন একটি জাতিকে উন্নতির চরম শিখরে পৌছে দিতে পারে, ঠিক তেমনি ত্রুটিপূর্ণ নেতৃত্ব একটি জাতিকে নিয়ে যেতে পারে ধ্বংসের অতল গহ্বরে। যেমন-মালয়েশিয়ার দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, সেখানকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ তাঁর দীর্ঘ বাইশ বছরের শাসনামলে বিপর্যস্ত মালয়েশিয়াকে বিশ্বের বুকে অন্যতম ধনী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। একই কথা চীনের মাও সেতুং এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশ আজ যে বিশ্বের বুকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের পরিচিতি নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার পিছনেও রয়েছে এর নেতৃত্বের গুণাবলি। তবে নেতৃত্ব বলতে যে কেবল পুরুষের নেতৃত্বই বুঝায় তা কিন্তু নয়। যুগ যুগ ধরে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

নারী নেতৃত্ব হিসেবে শেখ হাসিনা : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার সময় শেখ হাসিনা ছিলেন বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে। পরবর্তীতে দেশে এসে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। সুদীর্ঘ ২১ বছর পরে বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করে।
ক্ষমতা গ্রহণের পর শেখ হাসিনা তাঁর শাসনামলে যেসব উল্লেখযোগ্য কর্ম সম্পাদন করেন, সেগুলো নিম্নরূপ :

১. ঐকমত্যের সরকার গঠন : ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতীয় সমস্যার মোকাবিলা শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে দেশ শাসনের মাধ্যমেই সম্ভব নয়, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য দলমতনির্বিশেষে ঐকমত্য আবশ্যক। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সরকার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

২. গঙ্গার পানি সমস্যার চুক্তি স্বাক্ষর : নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মোতাবেক হাসিনার সরকার ভারতের সাথে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের যে দীর্ঘদিনের সমস্যা ছিল তা সমাধানের উদ্যোগ নেয় এবং এ লক্ষে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ৩০ বছর মেয়াদি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শেখ হাসিনার বড় ধরনের সাফল্যের মধ্যে এটি অন্যতম।

৩. জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধন : আওয়ামী লীগ সরকার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধন করে। সংশোধিত কার্যপ্রণালী বিধিতে মন্ত্রীর পরিবর্তে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।


আরো ও সাজেশন:-

৪. পার্বত্য শান্তিচুক্তি : দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদেরকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশে প্রকট সমস্যা দেখা দিয়েছিল। অতীতে বিভিন্ন সরকার চেষ্টা করেও এর সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সমস্যা সমাধানের লক্ষে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর এক চুক্তি সম্পাদন করেন এবং ১৯৯৮ সালের ৩-৬ মে এর উপর ভিত্তি করে সংসদে চারটি বিল পাস হয়।

৫. স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস : ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ৮ সদস্য বিশিষ্ট একটি স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন করে। এ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী গ্রাম পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এ চার স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার কাঠামো গৃহীত হয়েছে। প্রতিটি স্তরে মহিলাদের প্রতিনিধিত্বের বিশেষ বিধান একে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে।

৬. সংসদীয় ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ : আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা দিয়েছিল যে, জাতীয় সংসদ হবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ও আইন প্রণয়নের প্রাণকেন্দ্র। ‘৯৬ এর নির্বাচনে ক্ষমতায় আসারপর হাসিনা সরকার এ বিষয়টি কার্যকর করে।

৭. আশ্রয়ণ কর্মসূচি : সরকার ভূমিহীন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ‘আশ্রয়ণ’ নামে একটি আর্থসামাজিক প্রকল্প শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত উদ্যোগে গ্রহণ করে। মূলত এ প্রকল্প ১৯৯৭ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বাস্তবায়ন করা হয়।

৮. মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে গৃহীত পদক্ষেপ : শেখ হাসিনার সরকার মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের কল্যাণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, অসচ্ছল ও দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা প্রদান, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য সরকারি চাকরিতে ৩০ ভাগ কোটা সংরক্ষণ, মৃত্যুর পর মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন, প্রবীণ ও অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা পল্লি গড়ে তোলার ব্যবস্থা ইত্যাদি ।

৯. জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন : শেখ হাসিনার সরকার শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য কুদরত-ই খুদা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী একটি বাস্তব, গণমুখী ও যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়নের লক্ষে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি গঠন করে। পাঠ্যপুস্তকে স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত প্রকৃত ইতিহাস এ সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পরেই অন্তর্ভুক্ত করে।

১০. সার সংকটের সমাধান : আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে অসৎ ও দুর্নীতিপরায়ণ লোকের অভাব থাকে না। শেখ হাসিনার সরকার প্রশাসনিক ও লাইসেন্সধারী ডিলারদের রেখেই সুষ্ঠু তদারকির মাধ্যমে সার বণ্টনের বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে সমাধান করে সাফল্য অর্জন করে।

১১. জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন : ১৯৯৬ সালের অক্টোবর মাসে শেখ হাসিনার সরকার জনপ্রশাসন কমিশন গঠন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল দেশের প্রশাসনকে দক্ষ, গতিশীল, স্বচ্ছ, জবাবদিহি ও দুর্নীতিমুক্ত করা।


Paragraph/Composition/Application/Email/Letter/Short Storiesউত্তর লিংক
ভাবসম্প্রসারণ/প্রবন্ধ, অনুচ্ছেদ/ রচনা/আবেদন পত্র/প্রতিবেদন/ চিঠি ও ইমেলউত্তর লিংক

১২. নারীর ক্ষমতায়ন : শেখ হাসিনার সরকার নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সন্তানের পরিচয় প্রদানে পিতার সাথে মায়ের নাম উল্লেখ থাকার বিধান, ইউনিয়ন পরিষদে মহিলা আসনে সরাসরি
নির্বাচনের ব্যবস্থা, বিচারক, সচিব, কূটনীতিকসহ সরকারি উচ্চপদে মহিলাদের নিয়োগ এবং বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীতে প্রথমবারের মতো মহিলাদের নিয়োগদানের ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য।

১৩. জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি : প্রত্যেক জাতির একটি জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি থাকা আবশ্যক। এ বিষয়টি উপলব্ধি করে শেখ হাসিনার সরকার একটি জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন কমিটি গঠন করে।

১৪. খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন : পূর্বে আমাদের দেশে খাদ্য ঘাটতি লেগেই ছিল। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার সরকার গঠনের পর থেকে বাংলাদেশে পরপর চার বছর খাদ্যের বাম্পার ফলন হয়। ফলে দেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

১৫. অবকাঠামোগত উন্নয়ন : যমুনা সেতুর নির্মাণ কাজ শেখ হাসিনার শাসনামলেই সমাপ্ত হয়। তাঁর শাসনামলে দেশে বেশকিছু রাস্তাঘাট, পুল, কালভার্ট ইত্যাদি নির্মিত হয়েছে।

১৬. আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস : শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর এ মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, মাতৃভাষার জন্য বাঙালির জীবন উৎসর্গের সেই মহান একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বের সব ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উপলক্ষে প্রতিবছর পালন করবে। এটা বাঙালিদের জন্য নিয়ে আসে ব্যাপক গৌরব। আর এটা শেখ হাসিনার সরকারের একটি বিশাল অর্জন।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, নারী নেতৃত্ব হিসেবে শেখ হাসিনার শাসনামলের সাফল্য ব্যাপক। স্বাধীনতার পর দেশের যতগুলো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে শেখ হাসিনার সাফল্য তাদের কারো তুলনায় কম নয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন এবং ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নারীরাও যে পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে নেই, এটি তারই বাস্তব পরিচয় বহন করে।

প্রশ্ন ও মতামত জানাতে পারেন আমাদের কে ইমেল : info@banglanewsexpress.com

আমরা আছি নিচের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুলোতে ও

Leave a Comment