ছাগল কী জান্নাতের প্রাণী!

ছাগল জান্নাতের প্রাণী!
▬▬▬✪✪✪▬▬▬
প্রশ্ন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমারা ছাগলের কদর করো এবং তার শরীরের ধুলোমাটি ঝেড়ে দাও। কারণ ছাগল জান্নাতি প্রাণী।” এ হাদিসটি কি সহিহ? সহিহ হলে এর ব্যাখ্যা কি?
উত্তর:
হ্যাঁ, এ মর্মে বর্ণিত হাদিসটি সহিহ। নিম্নে এ সংক্রান্ত একাধিক হাদিস, হাদিসের মান, ব্যাখ্যা এবং ছাগল সংক্রান্ত কিছু ইসলামের কিছু বিধিবিধান সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হল:
আবু হুরায়রা রা. ও আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
صَلُّوا فِي مَرَاحِ الْغَنَمِ، وَامْسَحُوا بِرُغَامِهَا، فَإِنَّهَا مِنْ دَوَابِّ الْجَنَّةِ»
“তোমারা ছাগল বাধার স্থানে (ছাগলের খোয়াড়ে) সালাত আদায় করো এবং তার শরীরের ধুলোমাটি (ও নাকের ময়লা) মুছে দাও। কারণ তা জান্নাতের প্রাণী সমূহের অন্তর্ভুক্ত।”
❑ হাদিসটি উৎস এবং মান:

  • ইমাম বাগভী বলেন, হাদিসটি হাসান। [সূত্র: শারহুস সুন্নাহ ১/১৪১]
  • শাইখ আলবানি বলেন, হাদিসটি সহিহ। [সূত্র: সহিহুল জামে, হা/ ৩৭৮৯]
  • ইমাম বাইহাকী বলেন, এ হাদিসটি মারফু এবং মউকুফ উভয়ভাবেই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু মাওকুফ (সাহাবির বক্তব্য) হওয়াটাই অধিক বিশুদ্ধ। তবে এটি মারফু হাদিসের হুকুমে। [সূত্র: আস সুনানুল কুবরা ২/৪৪৯]
    এ হাদিসের সমার্থবোধক আরও একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেমন:
    عبدالله بن عمر وأبو هريرةعَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:
    عليكم بالغَنمِ ، فإنَّها من دوابِّ الجنةِ ، وصَلُّوا في مُراحِها ، وامسحُوا رِغامَها- صحيح الجامع-ا4073
    عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَكْرِمُوا الْمِعْزَى، وَامْسَحُوا بِرُغَامِهَا، فَإِنَّهَا مِنْ دَوَابِّ الْجَنَّةِ»، وَإِسْنَادُهُ ضَعِيفٌ، لَكِنَّهُ يُقَوِّيهِ هَذَا الْمَوْقُوفُ الصَّحِيحُ
    ❑ উপরোক্ত হাদিসটির ব্যাখ্যা:
    ১) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উম্মতকে তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য উপকারী বিষয়ে তাদের সমাজ ব্যবস্থা ও অবস্থার আলোকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

২) উক্ত হাদিসে ছাগল প্রতিপালন ও ছাগলের প্রতি যত্ন নেয়ার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
২) মুহাদ্দিসগণ বলেন, (هذا إشارةٌ إلى طَهارتِها) ছাগল বাধার স্থান বা ছাগলের খোয়াড়ে (ছাগল যেখানে রাত কাটায়) সালাত আদায় করার দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, উক্ত স্থানটা পবিত্র। সুতরাং কেউ যদি সেখানে দরকার বোধে সালাত আদায় করে তাহলে তার সালাত সহিহ হবে।
৩) জান্নাতে দুনিয়ার পশু-পাখীর নামের অনুরূপ কিছু পশু-পাখী আছে-যেগুলোর প্রকৃত আকার-আকৃতি আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না।
প্রকৃতপক্ষে জান্নাতে যে সব পশু, পাখি, ফল-মূল ইত্যাদি রয়েছে বলে বিভিন্ন হাদিসে উল্লেখিত হয়েছে সেগুলো কেবল নামের ক্ষেত্রে মিল আছে। বাস্তবে জান্নাতেরগুলো যে কত সুন্দর, সুস্বাদু ও মূল্যবান তা মানুষের কল্পনা করা সম্ভব নয়।
❑ ‘ছাগল জান্নাতি প্রাণী’ এ কথার অর্থ কি?
◉ মুনাবী (মুহাম্মদ আব্দুর রঊফ আল মুনাবী, জন্ম: ৯৫১ মৃত্যু: ১০৩১-মিসর) তাইসির গ্রন্থে বলেন,
(الشَّاة من دَوَاب الْجنَّة) أَي الْجنَّة فِيهَا أشياه. وأصل هَذِه مِنْهَا، لَا أَنَّهَا تصير بعد الْموقف إِلَيْهَا؛ لِأَنَّهَا تصير تُرَابا؛ كَمَا فِي الخبر. انتهى.”
“ছাগল জান্নাতের প্রাণী” এ হাদিসের অর্থ হল, জান্নাতে ছাগল আছে আর দুনিয়ার ছাগলের মূল হল সেগুলো। তার অর্থ এই নয় যে, হাশরের পর এ সব ছাগল জান্নাতে যাবে। কারণ হাশরের ময়দানে সেগুলো মাটিতে পরিণত হবে যেমনটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।”
◉ “ছাগল জান্নাতের প্রাণী” এ কথার ব্যাখ্যায় কানাযুঈ (القنازعي) শরহুল মুয়াত্তায় বলেন,
(فإنَّهَا مِن دَوَابِّ الجَنَّةِ)، يَعْنِي: هِيَ مِنْ طَعَامِ أَهْلِ الجَنَّةِ، قالَ اللهُ -جَلَّ وَعَزَّ- في أَهْلِ الجَنَّةِ: {وَأَمْدَدْنَاهُمْ بِفَاكِهَةٍ وَلَحْمٍ مِمَّا يَشْتَهُونَ} [الطور: 22] يَعْنِي بهِ: لَحْمَ الضَّأنِ. انتهى
“ছাগল জান্নাতি প্রাণী’ অর্থ হল, তা জান্নাতবাসীদের খাবার। যেমন আল্লাহ বলেন, “আর আমারা তাদেরকে বাড়িয়ে দেব ফলমূল এবং গোশত যা তারা কামনা করবে।” (সূরা তুর: ২২) উদ্দেশ্য হল, ছাগল বা ভেড়ার গোশত।
❑ ইসলামে ছাগল সংক্রান্ত কিছু বিধিবিধান:
কুরআন-হাদিস ছাগল সংক্রান্ত অনেক আলোচনা এসেছে এবং এর সাথে বেশ কিছু বিধিবিধান জড়িত রয়েছে। যেমন:
১. কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, মুসা আলাইহিস সালাম ছাগল চরিয়েছেন। (সূরা ত্ব-হা ১৭ ও ১৮)
২. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাল্যকালে ছাগল চরিয়েছেন। (সহিহ বুখারি)
৩. বরং সকল নবী-রাসূল ছাগল চরিয়েছেন।
روى البخاري في صحيحه من حديث أبي هريرة رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: «مَا بَعَثَ اللَّهُ نَبِيًّا إِلَّا رَعَى الغَنَمَ»، فَقَالَ أَصْحَابُهُ: وَأَنْتَ؟ فَقَالَ: «نَعَمْ، كُنْتُ أَرْعَاهَا عَلَى قَرَارِيطَ لِأَهْلِ مَكَّةَ»
৪. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, السَّكِينَةُ فِي أَهْلِ الغَنَمِ “ছাগল ওয়ালাদের মধ্যে প্রশান্তি রয়েছে।” (বুখারি ও মুসলিম)
৫. ইসলামে ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি দ্বারা আকিকা দেয়া সুন্নত; উট, গরু ইত্যাদি দ্বারা নয়।
৬. যে সব গবাদি পশু দ্বারা কুরবানি দেয়া জায়েজ সেগুলো হল, উট, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা (নর ও মাদী)।
৭. যে সব গবাদি পশু দ্বারা হাজিদের জন্য হাদি (হজ্জের কুরবানি) দেয়া জায়েজ সেগুলো হল, উট, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা (নর ও মাদী)।
৮. অধিক বিশুদ্ধ মতে, ওজু থাকা অবস্থায় ছাগলের গোস্ত খেলে ওজু ভঙ্গ হয় না কিন্তু উটের গোশত খেলে ওজু ভঙ্গ হয়ে যায়। (সহিহ মুসলিম) যদিও এ বিষয়ে আলেমদের মাঝে দ্বিমত রয়েছে।
৯. ছাগলের খোয়াড়ে সালাত আদায় করা জায়েজ (পূর্বোল্লিখিত হাদিস) পক্ষান্তরে উটের খোয়াড়ে সালাত আদায় করতে হাদিসে নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে।
১০. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়াকে একটা মৃত কানকাটা ছাগল ছানার সাথে তুলনা করেছেন।
১১. এ ছাড়াও ছাগলের গোশত খাওয়া, দুধ পান করা, ছাগলের চামড়া পরিশোধন (ট্যানারি) করে কাজে লাগানো, ছাগলের যাকাত প্রদান ইত্যাদি বিষয়ে অনেক হাদিস রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে জান্নাতবাসী হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
▬▬▬✪✪✪▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আর

Leave a Comment