ইসলাম বষিয়ক প্রবন্ধ: মুহাররম ও আশুরার আমল

ইসলাম বষিয়ক প্রবন্ধ: মুহাররম ও আশুরার আমল

ইসলাম ধর্ম
শেয়ার করুন:

ইসলাম বষিয়ক প্রবন্ধ: মুহাররম ও আশুরার আমল

আসমান জমিনের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা। দিন রাতের পরিবর্তন। সময়ের বিবর্তন। চাঁদ ও সূর্যের পরিবর্তন। সবই আল্লাহর ইচ্ছায়, যথা সময়ে নির্দিষ্টভাবে প্রতিনিয়ত পরিচালিত হচ্ছে। যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেন: আর সূর্য তার নির্দিষ্টে গন্তব্যে ভ্রমণ করে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহ তাআলার নিয়ন্ত্রণ। :সুরা ইয়াসিন : ৩৮

এভাবেই সময়ের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রতি বছরের মতো আরও একটি হিজরি নতুন বছর যোগ হলো। শুরু হলো হিজরি ১৪৪৩। বারোটি চান্দ্রমাসে একটি হিজরি সন। মুহাররম এটি হচ্ছে আরবি তথা হিজরি সন গণনায় প্রথম মাস। অর্থাৎ, এটি হচ্ছে হিজরি নববর্ষ। ১লা মুহাররম হিজরি নববর্ষের সূচনা। যদিও জন্ম মৃত্যু ইত্যাদি কোনো দিবসই প্রথা অনুযায়ী পালন করা জরুরি নয়! তবে রমজানের রোযা, হজ প্রভৃতি শরয়ী বিধান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ও ধারণা লাভের জন্য হিজরি বর্ষ-জ্ঞান রাখা ফরযে কেফায়া। তএকজন সচেতন মুসলমান হিসাবে ইবাদত পালনের সঠিক সময় সম্পর্কে অবহিত হওয়া আমাদের সকলের দায়িত্ব। তাই বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আমাদের আরবি মাসের তারিখও গণনা করা উচিত।

আর হাদিসের ভাষায় মুহাররম হলো, আল্লাহর মাস। বিগতে দিনের হিসাব নিকাশ। নেক আমল ও ভালো কাজের হিসাব কষার সময়। জীবন থেকে ফুরিয়ে যাওয়া আরও একটি বছরের হিসাব করার সময় মুহাররম। একই সাথে এটি শোকরের মাস। সব রকমের নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা স্বীকারের মাস। সকল নিয়ামতের শোকর ও কৃতজ্ঞতা আদায়ের মাস। বিগত দিনের অন্যায় অনাচার পাপাচারকে ভুলে; নতুন দিনে নব উদ্যমে ইবাদত বন্দেগি শুরু করার মাস মুহাররম। বিশেষ করে ১০ই মুহাররম আশুরার দিনে রোযার রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য ও বৈশিষ্ট্য।

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত- রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-রমযানের পর সবচে উত্তম রোযা হলো মুহাররম মাসের রোযা। :সহিহ মুসলিম

জনৈক সাহাবির প্রশ্নের জবাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- যদি তুমি রমযানের পর রোযা রাখতে চাও। তবে তুমি মুহাররমে রোযা রাখো। কেননা এটা আল্লাহ তাআলার মাস। যাতে এমন একটি দিন রয়েছে, যে দিন আল্লাহ তাআলা একটি গোত্রের তাওবা কবুল করেছেন। আরও অন্যান্য গোত্রের তাওবাও আল্লাহ তাআলা কবুল করবেন। -সুনানে তিরিমিজি

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত- নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় আগমন করেন, তখন তিনি মদিনাবাসীকে একদিন রোযা রাখতে দেখলেন। অর্থাৎ আশুরার দিন। তারা বলল এটি একটি মহান দিবস। আর এটা হলো এমন দিবস যে, আল্লাহ তাআলা যে দিন হযরত মুসা আ.-কে মুক্তি দান করেছিলেন। ফেরআউন সম্প্রদায়কে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। মুসা আ. কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে এই দিন রোযা রেখেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- তাদের তুলনায় আমি মুসা আ. (অনুসরণ)এর অধিক নিকটবর্তী। অতঃপর তিনি রোযা রেখেছেন এবং এ দিনে রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। -সহিহ বুখারি

সহিহ মুসলিমের এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আশুরার দিনের রোযা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন-(এই দিন রোযা রাখার দ্বারা) বিগত বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে। অর্থাৎ, ১০ই মুহাররমের দিন একটি রোযা রাখার বিনিময়ে পিছনের এক বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।

সুনানে আবু দাউদের একটি হাদিসে ইহুদিদের বিপরীত আমলের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। তাই ১০ই মুহাররম যেহেতু কোনো কোনো ইহুদি রোযা রাখেন। তাই তাদের বিপরীত করার জন্য আমাদেরকে নয় অথবা এগারো তারিখ আরও একটি রোযা উচিত। যাতে তাদের সাদৃশ্য না হয়।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, আশুরার দিন আমাদের জন্য করণীয় আমল দুটি। ১. নফল রোযা রাখা। ২. তাওবা-ইস্তেগফার করা। আর রমযানের পর সবচে উত্তম হলো মুহাররম মাসের রোযা। তাই আমরা সাধ্য অনুযায়ী চাইলে পুরো মুহাররম মাস জুড়েই নফল রোযা রাখতে পারি। আর ১০ই মুহাররমের একটি রোযা বিগত বছরের জন্য গুনাহ মাফের কাফফারা স্বরূপ। এ ছাড়া কুরআন সুন্নাহর আলোকে মুহাররম বা আশুরার জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো আমল প্রমাণিত নেই। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হিজরি এই নতুন বর্ষে বিগত দিনের পাপ মোচন করে ; তাওবা করে, নব উদ্যমে পথ চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : ইসলাম বিষয়ক গবেষক / মীযান মুহাম্মদ হাসান

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *