আরব বসন্ত বলতে কী বোঝায়,আরব বসন্তের আরেক নাম কী

ভুমিকাঃ আরব বসন্ত নামে যে দমকা হাওয়া উলট-পালট করে দিয়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে, সেই মাতাল বসন্ত হাওয়ার পরাগায়ন সমৃদ্ধ ফুল পূর্ণ সৌন্দর্যে আজ বিকশিত হচ্ছে তিউনিসিয়ায়।

প্রায় ৭ বছর আগে সবজি বিক্রেতা বু আজিজির আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে তিউনিসিয়া থেকেই প্রথম শুরু হয়েছিলো আরব জাগরণ। আর জাগরণের ধাক্কায় টালমাটাল হয় আরব বিশ্বের দেশগুলোতে যুগ যুগ ধরে চলে আসা স্বেচ্ছাচারী শাসনের ভিত্তিমূল।

তবে আরব জাগরণের ধাক্কায় আরব দেশগুলোর শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন কতটুকু তা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ হলেও, বিপ্লবের জননী হিসেবে পরিচিত তিউনিসিয়ায় আরব বসন্তের ফুল কিন্তু ঠিকই ফুটছে পূর্ণ বিকশিত রূপে।
‘আরব বসন্তে’র দোলায় মধ্যপ্রাচ্য অস্থিরতা ছড়িয়েছে কিন্তু স্থিতিশীলতা কিংবা সমৃদ্ধি আসেনি।

মিসরে এক সরকারকে হটিয়ে আরেক সরকার সিংহাসনে বসেছে, লিবিয়া জুড়ে চলছে বিশৃঙ্খলা, গৃহযুদ্ধের আগুনে পুড়ে মরছে সিরিয়া, দেশটির লাখ লাখ মানুষ ঘর ছেড়ে এখন খোলা আকাশের নিচে ঘুরছে। বাস্তবতা হচ্ছে ‘আরব বসন্ত’টা হলো পশ্চিমাদের রং দেয়া ‘রং বিপ্লব’ এর মহড়া।

স্নায়ু যুদ্ধ চলাকালে পশ্চিমাদের ইন্ধনেই ভেঙে গিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। আর সে সময়টাতেই পশ্চিমারা ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে শাখা মেলার সুযোগ তৈরি করে।কিন্তু রাশিয়ার পুর্নজাগরণে তাদের এ যুদ্ধ ভেস্তে যায়। রাশিয়াকে বাদ দিয়ে পশ্চিমারা তাদের নজর ফেরায় মধ্যপ্রাচ্যের দিকে।

২০১১ সালটাতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও দ্বন্দ্ব বিস্তার লাভ করে। আর এ সুযোগটাকে মোক্ষম সময় হিসেবে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের কাজে লাগায় পশ্চিমারা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন ও বিক্ষোভকে ‘আরব বসন্ত’ বলে প্রচার করে পশ্চিমা মিডিয়াগুলো।

আর এসব আন্দোলনে পশ্চিমা সরকারেরা হস্তক্ষেপ করে এবং তাদের স্বার্থের বিষয় মাথায় রেখে মধ্যপ্রাচ্যে উন্নয়ন কাজে বিনিয়োগ করে।

চলমান বিক্ষোভ ও আন্দোলনের মুখে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ না করে বরং তারা বিশৃঙ্খলার বীজই বপন করে যাচ্ছে। পশ্চিমাদের তৈরি করা ‘আরব বসন্ত’ কোন রদ-বদলতো আনতেই পারেনি বরং আরেক সংকটে পড়েছে মিসর, লিবিয়া ও সিরিয়া।

আরব বসন্ত কি?

২০১০ সালের শুরু থেকে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বয়ে যাওয়া গণবিপ্লবের ঝড়কে পশ্চিমা সাংবাদিকরা আরব বসন্ত হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। গণবিক্ষোভের শুরু মিশরে; এরপর তা লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন সহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে যায়।

প্রথমে মিশরে প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের পতন হয়। পরে লিবিয়ায় মুয়াম্মর আল-গাদ্দাফি জামানার অবসান হয়। আরব বিশ্বের এই গনঅভ্যূত্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং এর ইউরোপীয় ন্যাটোভুক্ত সহচর রাষ্ট্রগুলো অস্ত্র সরবরাহ করে এবং সরাসরি আঘাত হেনে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রনায়কের পতন ঘটায়।

এক হিসাবে বলা হয় আরব বসন্তের ফলে মাত্র পৌনে দুই বছরে লিবিয়া, সিরিয়া, মিশর, তিউনিসিয়া, বাহরাইন ও ইয়েমেনের গণ-আন্দোলনের ফলে মোট দেশজ উৎপাদনের ক্ষতি হয়েছে দুই হাজার ৫৬ কোটি ডলার। ডিসেম্বর ২০১০ থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় যে গণ বিদ্রোহ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন হচ্ছে তা ইতিহাসে নজিরবিহীন।

এ পর্যন্ত আলজেরিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন, মিশর, ইরান, জর্ডান, লিবিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়ায় বড় ধরণের বিদ্রোহ হয়েছে এবং ইরাক, কুয়েত, মৌরিতানিয়া, ওমান, সৌদি-আরব, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়াতে ছোট আকারের ঘটনা ঘটেছে।

এসব বিদ্রোহে প্রতিবাদের ভাষারূপে গণবিদ্রোহের অংশ হিসেবে হরতাল, বিক্ষোভ প্রদর্শন, জনসভা, র‍্যালি প্রভৃতি কর্মসুচী নেয়া হয়। দেশব্যাপী সাংগঠনিক কাজ, যোগাযোগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারণার থেকে জনগণের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে ফেসবুক, টুইটারের মত সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ব্যবহৃত হয়।

এরই মধ্যে তিউনিসিয়া, মিশরে বিদ্রোহের ফলে শাসকের পতন হয়েছে বলে এখানে তা বিপ্লব বলে অভিহিত করা হচ্ছে। বিভিন্ন কারণে এমন বিদ্রোহের সূচনা হয় যার মধ্যে সরকারি দুর্নীতি, স্বৈরতন্ত্র, মানবাধিকার লংঘন, বেকারত্ব এবং চরম দারিদ্র্যের অভিযোগের পাশাপাশি বিশাল যুবসমাজের অংশগ্রহণও অনুঘটকরূপে কাজ করেছে। এর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং খরার প্রকোপও বড় কারণ।

[ বি:দ্র: নমুনা উত্তর দাতা: রাকিব হোসেন সজল (বাংলা নিউজ এক্সপ্রেস)]

১৮ ডিসেম্বর তিউনিসিয়ায় মোহাম্মদ বোয়াজিজির পুলিশে দুর্নীতি ও দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে আত্মাহুতির মাধ্যমে বিদ্রোহ শুরু হয়। তিউনিসিয়ার বিপ্লব সফল হওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য দেশেও আত্মাহুতির কারণে অস্থিরতা শুরু হয় যার ফলে আলজেরিয়া, জর্ডান, মিশর ও ইয়েমেনে বিদ্রোহ শুরু হয়।

তিউনিসিয়ায় জেসমিন বিপ্লবের ফলে ১৪ জানুয়ারি শাসক জেন এল আবেদিন বেন আলির পতন ঘটে এবং তিনি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। ২৫ জানুয়ারি থেকে মিশরে বিদ্রোহ শুরু হয় এবং ১৮ দিনব্যাপী বিদ্রোহের পরে ৩০ বছর ধরে শাসন করা প্রেসিডেন্ট মুবারক ১১ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেন।

একই সাথে জর্ডানের বাদশাহ আব্দুল্লাহ নতুন প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করেন; ইয়েমেনের রাষ্ট্রপতি আলি আব্দুল্লাহ সালেহ ঘোষণা দেন যে তিনি ২০১৩ সালের পর আর রাষ্ট্রপতি থাকবেন না যা তখন ৩৫ বছরের শাসন হবে। বর্তমানে লিবিয়ার শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে পতনের চেষ্টা হচ্ছে এবং সুদানের রাষ্ট্রপতি আলি আব্দুল্লাহ সালেহ ঘোষণা দিয়েছেন তিনি ২০১৫ এর পর নির্বাচনে অংশ নেবেন না ।

এরূপ স্বতস্ফূর্ত গণবিক্ষোভ এবং এসব দেশের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে তা আজ গোটা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের কারণ।

আত্মাহুতিঃ

মোহাম্মদ বোয়াজিজির আত্মাহুতির পরে আরব বিশ্বে আরো অনেকগুলো আত্মাহুতির ঘটনা ঘটে। আলজেরিয়ায় মহসিন বৌটারফিফ শহরের মেয়রের সাথে একটি আলোচনায় ব্যর্থ হবার পর ১৩ জানুয়ারি, ২০১১ আত্মাহুতি দেন এবং ২৪ জানুয়ারি, ২০১১ মারা যান। মিশরে আব্দোউ আব্দেল-মোনেম জাফর ১৭ জানুয়ারি মিশরের সংসদের সামনে আত্মাহুতি দেন। সৌদি আরবে একজন ৬৫ বছর বয়সী অজ্ঞাত ব্যক্তি ২১ জানুয়ারি আত্মাহুতি দেন ও মারা যান ।

পটভূমিঃ

স্বৈরাচার বা চরম রাজতন্ত্র, মানবাধিকার লঙ্ঘন, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ( উইকিলিকসের মাধ্যমে ফাঁস হওয়া বিভিন্ন ফাইল ), দুর্বল অর্থনীতি, বেকারত্ব, চরম দারিদ্র্য ও শিক্ষিত হতাশাগ্রস্থ যুবসমাজ ইত্যাদি কারণে এইসব এলাকায় বিক্ষোভের সূচনা হয়।

এছাড়াও এসব দেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদ মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হাতে থাকায় তারা কয়েক দশক ধরে ক্ষমতায় ছিল, সম্পদের সুষম বন্টন হয় নি, খরা ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আন্দোলনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়।

ইন্টারনেট দিয়ে শুরু করা আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরা অনেকেই পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত যেখানে স্বৈরতন্ত্র ও রাজতন্ত্রকে অচল বলে মনে করা হয়। এওসব দেশে সাম্প্রতিক কালে জীবনযাত্রার মান, শিক্ষার হার বৃদ্ধির কারণে মানব উন্নয়ন সূচক এর উন্নতি হয়েছে কিন্তু তার সাথে সাথে সরকারের সংস্কার হয় নি। তিউনিসিয়া ও মিশরের অর্থনীতি তেলের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল ছিল না, যার ফলে সরকার বড় মাপের বিদ্রোহ দমনে ব্যার্থ হয়।

আরব বসন্তের শুরুঃ

২০১০-২০১১ তে আরবে আরব যুবকরা তাদের অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করলো যারা কিনা মধ্য প্রাচ্যে ১০০ বছরের বেশী সময় ধরে পশ্চিমা শাসন প্রতিষ্ঠা করে আসছে। এই বিদ্রোহের কারনে মুসলিম বিশ্বে অনেক পরিবর্তন দেখা যায়।

এটি ভালোভাবেই জানা যে যদি সত্যিকারের গণতন্ত্র মুসলিম বিশ্বে স্থাপন করা হয়, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমরা ইসলামিক শাসন বাস্তবায়নের জন্য এমন একটি দলকে ভোট দিবে যারা তাদের দেশ থেকে পশ্চিমা আধিপত্য ও জায়নিস্ট ইহুদীদেরকে তাড়িয়ে দিতে চায়।

ওই ১% (জায়নিস্ট), যারা কিনা পুরো বিশ্বের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং মুসলিমদের সম্পদগুলো লুট করে, তারা জানত যে মুসলিমরা যদি ইসলামিক নেতৃত্ব চায় তবে সেটা অনিবার্য হয়ে পড়বে, আর যদি ওই স্বৈরশাসন চলতে থাকে তবে মুসলিম জনতা বিদ্রোহ চালিয়ে যেতে থাকবে এবং এমনকি অস্ত্রও হাতে তুলে নিতে পারে ও মিসরকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে (যা কিনা ইসরায়েলের পাশেই)।

মিসর এবং বিদ্রোহ চলা অন্যান্য দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক উপায়ে ভোট গ্রহনের এক আচমকা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় (১০০ বছরেরও বেশী সময় ধরে চলে আসা স্বৈরশাসনের পর)। নিজেদের মুখ রক্ষার জন্যই আমেরিকা এটি করেছিলো কারন পুরো বিশ্ব এই বিদ্রোহের খবর দেখছিল এবং যদি আমেরিকা ওই দেশগুলোর জনগনের নিজেদের নেতাকে খুজে নেওয়ার অধিকার সমর্থন না করত তাহলে তাদের ওই স্বৈরশাসনকে সমর্থন করার ব্যাপারে আমেরিকার ভণ্ডামি প্রকাশ হয়ে যেত।

মিসর, তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলোতে সংঘটিত নির্বাচনে ইসলামপন্থী সংঘটনগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ ভতে জয়লাভ করে। তারা ছিল মুসলিম ব্রাদারহুড এবং এই ধরনের ইসলামপন্থী সংঘটন যারা গণতন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল এবং একারনে তারাও পশ্চিমা অর্থনৈতিক কতৃত্ব ও চাপের নিচে ছিল।

[ বি:দ্র: নমুনা উত্তর দাতা: রাকিব হোসেন সজল (বাংলা নিউজ এক্সপ্রেস)]

মিশরের গণবিক্ষোভঃ

আরব বিশ্বে গণবিক্ষোভের শুরু মিশরে। মাত্র ১৭ দিনে পতন হয় প্রেসিডেণ্ট হোসনি মোবারকের ৩০ বছরের প্রতাপশালী শাসন। ২০১০-এর শুরুতে ২৫শে জানুয়ারি প্রথম গণবিক্ষোভ ছিল মিশরীয় জনগণের দীর্ঘকালের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহি:প্রকাশ।

১৭ দিন গণআন্দোলনের পর ১১ই ফেব্রুয়ারি হোসনি মোবারকের পতন হয়। ঐ দিন মিশরের সমস্ত মানুষ স্বৈরাচারি হোসনি মোবারকের অপসারণের দাবিতে গণবিক্ষোভে ফেটে পড়লে নব নিযুক্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট ওমর সোলাইমান টেলিভিশন ভাষণে হোসনি মোবারকের ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াবার ঘোষণা দেন।

প্রেসিডেন্টের পদ থেকে হোসনি মোবারকের সরে দাঁড়ানোর খবর মিশরবাসী উল্লাসে ফেটে পড়ে। ১৯৮১ সালে হোসনি মোবারক ক্ষমতায় আসার পর থেকে মিশরে কার্যত সেনাবাহিন সমর্থিত একনায়কতন্ত্র সূচনা হয়। পশ্চিমা দেশগুলো যারা শুরু থেকেই হোসনি মোবারককে নি:শর্তভাবে সমর্থন দিয়ে আসছিল, ক্ষমতা থেকে মোবারকের সরে দাঁড়ানোর পদক্ষেপকে স্বাগত জানায়।

মোবারক ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক উচ্চ পরিষদের সভাপতি মোহাম্মদ হোসেন তানতাভি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন। মূলত মিশরীয় সেনাবাহিনী মোবারকের পক্ষ ত্যাগ করে জনগণের পক্ষাবলম্ববন করার সিদ্ধান্ত নিলে দ্রুত পট পরিবর্তন ঘটে।

তিউনিশিয়ায় গণঅভ্যূথানঃ
মিশরে হোসনি মোবারকের পতনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হয়েছিল। কিন্তু ২০১১-এর শুরুতে আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি তিউনিশিয়ার গণঅভ্যূত্থানের ধারাবাহিকতাতেই যেন লিবিয়া, সিরিয়া, বাহরাইন প্রভৃতির গণ্যঅভ্যূত্থান। তিউনিশিয়ায় গণঅভ্যূথানে ২৪ বছরের একচ্ছত্র রাজত্বের “জাইন-এল আবেদিন বেন আলীর” পতন ঘটে। তিনি সৌদী আরবে পালিয়ে গিয়ে জীবন রক্ষা করেন।

লিবিয়ায় গণবিক্ষোভঃ

লিবিয়ায় গণবিক্ষোভ চলে প্রায় ৯ মাস। ২০১১-এর ফেব্রুয়ারিতে গাদ্দাফিবিরোধী বিক্ষোভ ও লড়াই শুরু হয়। ১৭ই ফেব্রুয়ারি ২০১১ তারিখে দ্বিতীয় দেশের বৃহত্তম শহর বেনগাজিতে গাদ্দাফিবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। বেনগাজিতে একটি থানার কাছে শত শত জনতা গাদ্দাফিবিরোধী বিক্ষোভ শুরু করে। এতে সহিংসতায় বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়।

এ দিনটিকে ‘দ্য ডে অব রিভোল্ট’ বলা হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি বেনগাজি শহর দখল করে নেয় বিদ্রোহীরা। এতে গাদ্দাফির অনুগত বাহিনী ও বিরোধীদের লড়াইয়ে কয়েক’শ মানুষ নিহত হয়। এর পরও গাদ্দাফির অনুগত বাহিনী বেনগাজি পুনরুদ্ধারে বেশ কয়েক সপ্তাহ লড়াই চালিয়ে যায়।

তবে শেষ পর্যন্ত পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। মার্চের ১০ তারিখে, গাদ্দাফি বাহিনী ব্রেগা শহরে বোমাবর্ষণ শুরু করে। বিদ্রোহীদের কাছ থেকে জায়িয়াহ ও বিন জাওয়াদ শহর পুনরুদ্ধার করে গাদ্দাফির সেনারা। এরপর ব্রেগা ও আজদাবিয়াহ শহরে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল লড়াই চলে। ১৯শে মার্চ তারিখে পশ্চিমা বিশ্ব গাদ্দাফি পতনের লক্ষ্যে জন্য আক্রমণ চালায়।

প্রথমে লিবিয়ায় বোমা নিক্ষেপ শুরু করে সামরিক জোট ন্যাটো। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বিতর্কের পর লিবিয়ায় নো ফ্লাই জোন কার্যকরের প্রস্তাব পাস হয়। ১৫ সদস্যের পরিষদে স্থায়ী দুই সদস্যরাষ্ট্র রাশিয়া, চীনসহ পাঁচটি সদস্যরাষ্ট্র ভোটের সময় অনুপস্থিত থাকে।

১৫ই মে তারিখে গাদ্দাফি সাগর তীরের শহর মিসরাতা থেকে তাঁর বাহিনী প্রত্যাহার করে নেন। এর আগে কয়েক সপ্তাহ শহরটি অবরোধ করে রাখা হয়। সেখানে যুদ্ধে বেসামরিক নাগরিকসহ উভয় পক্ষের বহু সেনা হতাহত হয়। ১৫ই আগস্টে বিদ্রোহীরা রাজধানী ত্রিপোলির দিকে অভিযান শুরু করে।

দ্রুত ত্রিপোলির ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণের ঘরান এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় বিদ্রোহীরা। ২১শে আগস্ট তারিখে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে ঢুকে পড়তে সক্ষম হয় বিদ্রোহী বাহিনী। রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে “গ্রিন স্কয়ারে” পৌঁছে বিদ্রোহীরা।

তারা ওই স্কয়ারের নাম পরিবর্তন করে “শহীদ চত্বর” নাম দেয়। দুদিন পর ২৩শে আগস্ট গাদ্দাফির আবাসস্থল “বাব আল-আজিজিয়া”র পতন। তবে সেখানে গাদ্দাফি বা তাঁর পরিবারের কাউকে খুঁজে পায়নি বিদ্রোহীরা। সেপ্টেম্বর মাসের ১১ তারিখে নাইজার জানায়, গাদ্দাফির ছেলে “সাদি গাদ্দাফি” সে দেশে প্রবেশ করেছে।

১৬ই সেপ্টেম্বর তারিখে লিবিয়ার একমাত্র বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিদ্রোহীদের গঠিত “ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল”কে (এনটিসি) সমর্থন দেয় জাতিসংঘ। ১৭ই অক্টোবর গাদ্দাফির শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত “বনি ওয়ালিদ” দখল করতে সক্ষম হয় বিদ্রোহী বাহিনী।

পরদিন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এক ঝটিকা সফরে লিবিয়ায় যান। তিনি বিদ্রোহীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। অক্টোবর ২০: সিরত শহরে লড়াইয়ে নিহত হন গাদ্দাফি।

[ বি:দ্র: নমুনা উত্তর দাতা: রাকিব হোসেন সজল (বাংলা নিউজ এক্সপ্রেস)]

সিরিয়ার বিদ্রোহঃ

সিরিয়ার বিদ্রোহ হল একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ঘতে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা সমূহের মধ্যে একটি দুঃখজনক মোড়।
২০১১ সালে শুরু হওয়া আলাওয়ীদের (শিয়াদের একটি উপদল ) স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ব্যাপারে সিরিয়ার জনগণ যথেষ্ট সাহসী ছিল।

১৯৭০ সালের প্রথম দিকে শুরু হওয়া আসাদ পরিবারের এই স্বৈরশাসন শুরু হয়েছিলো হাফিয আসাদকে দিয়ে এবং এখন তার ছেলে বাশার আল আসাদ প্রেসিডেন্ট হিসেবে আছে। সিরিয়ার জনগণ তাদের অত্যাচারী শাসক আর গোপন পুলিশ (শাবিহা, যার অর্থ হল প্রেতাত্মা) দিয়ে নির্যাতিত হয়ে আসছিল এক দীর্ঘ সময় ধরে।

সিরিয়ার জনগনের অর্ধেকেরও বেশী লোক ছিল বাশারের স্বৈরতন্ত্র রক্ষার কাজে নিয়োজিত গোয়েন্দা (তারা তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে ভিত থাকার কারনে)। কোন মানুষকে যদি সামান্যও বিদ্রোহী, “অতিরিক্ত” ধার্মিক বা আসাদ-বিরোধি হিসেবে সন্দেহ করা হত, তখন তার পুরো পরিবারের লকজন ধরে নিয়ে এসে ধর্ষণ,কারারুদ্ধ,নির্যাতন, অঙ্গ-প্রত্তঙ্গ কেতে ফেলার মতো শাস্তি দেওয়া হতো এবং মেরে ফেলা হতো।

এই স্বৈর শাসন আর আতঙ্ক সিরিয়াতে প্রায় ৫০ বছর ধরে (১৯৬৩-২০১২ +) টিকে আছে। হাজার হাজার সিরিয়ানদেরকে আলাওয়ী শিয়ারা ধর্ষণ ও হত্যা করেছিলো (এখনও করছে) যারা সংখ্যা গরিষ্ঠ সুন্নিদেরকে তাদের শত্রু মনে করে।

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “যখন শামের (সিরিয়া, জর্ডান, প্যালেস্টাইন) লোকেরা পথভ্রষ্ট হবে তখন তোমাদের মধ্যে কোন কল্যাণ থাকবে না। আমার উম্মতের মধ্য থেকে একদল লোক আল্লাহর সাহায্য পেতে থাকবে, যারা তাদের বিরোধিতা করবে তারা শেষ সময় পর্যন্ত তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।” (তিরমিযি ২/৩০ –নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত)

একইভাবে, শামের লোকেরা যখন ভাল হয়ে যাবে তখন মুসলিমদের বাকি অংশও ভাল হয়ে যাবে এবং সফল ও সমৃদ্ধ হবে।

যেহেতু পশ্চিমা শক্তি ও জায়নিস্ট্ররা মিসরের এই পরিবর্তনটি সাপোর্ট করেছিলো (২০ বছরের বেশী সময় ধরে চলা হোসনী মুবারকের স্বৈরতন্ত্রকে ২০১০-১১ এর পর গনতন্ত্রে পরিবর্তন করা) মিসরের জনগনের অভ্যুত্থানের কারনে, তাই একনায়কতান্ত্রিক বাশার আল আসাদকে সাপোর্ট করা তাদের জন্য একটি ভণ্ডামিপূর্ণ আচরণ হিসেবে প্রকাশ হবে।।

এর কারনে সিরিয়ার নির্যাতিত বিদ্রোহীদের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকল এ আশায় যে বাশার আল আসাদের সরকার (যারা কিনা জায়নিস্ট ইসরাইলকে ইসলামপন্থীদের কাছ থেকে রক্ষা করছিলো ) ওই অভ্যুত্থানকে দমন করতে পারবে।

শাবিহারা (সিরিয়ার গোপন পুলিশ ) শান্তিপূর্ণ মিছিলকারীদের উপর গুলি চালান শুরু করলো এবং তারা বিশ্বের অন্যান্য সম্প্রদায়ের কাছে সাহায্য চাইল। কিন্তু বিশ্বের কোন শক্তিই তাদের সাহায্য করলো না। ধীরে ধীরে কিছু নিন্ম পদস্থ সিরিয়ান সৈন্য সেনাবাহিনী ছেড়ে দিয়ে যেসব অস্ত্রধারী বিদ্রোহী সুন্নিদের রক্ষা করছিলো তাদের শক্তি আরও বৃদ্ধি করলো। তখন সেই সশস্ত্র বিদ্রোহ ধর্মীয় যুদ্ধের দিকে গরাতে লাগলো এবং অস্ত্রধারী বিদ্রোহীরা সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে লাগলো।

[ বি:দ্র: নমুনা উত্তর দাতা: রাকিব হোসেন সজল (বাংলা নিউজ এক্সপ্রেস)]

সিরিয়ার অভ্যুত্থানে আল কায়েদার সুচনাঃ (২০১১–১২)

ইসলামিক স্টেট অফ ইরাকের আমীর আবু বকর আল বাগদাদী সিরিয়ান মুসলিমদের সাহায্য করার জন্য তার অন্যতম সেরা মুজাহিদ আবু মুহাম্মাদ আল গুলানিকে ISI এর অর্ধেক সম্পদ দিয়ে সিরিয়াতে জিহাদ করার জন্য পাঠান এবং এর নাম দেন জাবহাত আল নুসরাহ।

জাবহাত আল নুসরাহ সিরিয়ান বিদ্রোহীদের সাহায্য করতে লাগলো কারন তারা ছিল সুন্নি (সুন্নি ও সালাফিরা সুন্নাহ অনুসরণ করে যা শিয়ারা করে না)। বিদ্রোহীরা দলত্যাগ করা সৈন্যদের কাছ থেকে ভারী অস্ত্র লাভ করে এবং অন্যান্য সিরিয়ান সৈন্যদের টাকা দিয়ে তাদের কাছ থেকে কিনে নেয়।

ইসলামিক স্টেট অফ ইরাকের সাহায্যে জাবহাত আল নুসরাহও শক্তিশালী অস্ত্র ও বোমা তৈরি করতে পারে এমন মুজাহিদিন কে পান। এর ফলে নতুন গড়ে উঠা বিদ্রোহী সেনাদের নিয়ে গঠিত FSA (ফ্রি সিরিয়ান আর্মি) শক্তিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং বড় বড় সফলতা পায়। আমি যে সময়ে এ লেখাটি লিখছি (নভেম্বর ২০১২ ) তখন সিরিয়ায় সরকার পক্ষ ও বিদ্রোহীদের মধ্যে ভারসাম্য দেখা যাচ্ছে।

পশ্চিমারা যখন বুঝতে পারল যে (২০১২ এর মধ্যবর্তী সময়) আসাদের সরকার আর বেশী দূর যেতে পারবে না, তখন তারা ঠিক করলো তারা সিরিয়ার উপর আধিপত্য চালু রাখার জন্য সিরিয়ার বিদ্রোহকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে সাপোর্ট করবে এবং এটা নিশ্চিত করবে যে ওই অভ্যুত্থানের শেষ ফলাফল হবে একটি গণতান্ত্রিক সিরিয়া যা পশ্চিমা স্বার্থ অনুযায়ী চলবে।

(আরব লোকেরা একে অবসস ভণ্ডামিই মনে করবে যেহেতু প্রায় ৫০ বছর ধরে চলে আশা আসাদ সরকারকে কোন পশ্চিমা শক্তি সমালোচিত করেনি অথবা সুন্নিদের বিরুদ্ধে এতদিন চলে আশা নির্যাতন দেখে আসার পরও একে অগণতান্ত্রিক বা মানব অধিকার বিরোধী বলে আক্ষ্যা দেয় নি। আর এখন তারা তাদের রক্তে বয়ে যাওয়া আদর্শ অনুযায়ী সিরিয়া শাসন করার জন্য ইসলামিক অভ্যুত্থান কারীদের সমালোচনা করছে ।

[ বি:দ্র: নমুনা উত্তর দাতা: রাকিব হোসেন সজল (বাংলা নিউজ এক্সপ্রেস)]

আল কায়েদার লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে মুসলিম ব্রাদারহুড যেভাবে সহায়ক হলঃ
আল কায়েদার মতাদর্শ মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো নয়। আল কায়েদার ফোকাস হল মুসলিম বিশ্বকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত করা এবং একে অপসারণ করা। তারা বিশ্বাস করে এটা করার পরই পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক আধিপত্য দূর করে সত্যিকারের ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে।

বর্তমানে মুসলিম ব্রাদারহুড পশ্চিমা আধিপত্যের ভিতরে থেকেই দেশ পরিচালনা করছে, যার কারনে তারা সত্যিকার ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর অনেক মানুষই এটা বুঝতে পারল যখন তারা দেখল মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড প্যালেস্টাইন স্বাধীনের ব্যাপারে সফল হতে পারছে না। গনতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ইসলামপন্থী দলগুলোকে ক্ষমতার আসনে বসানো তাদের জন্য স্বল্প মাত্রার সফলতা নিয়ে আসবে।

পশ্চিমারা চেষ্টা করবে মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো ইসলাম পন্থী দলগুলোর দীর্ঘ মেয়াদী ইসলামি এজেন্ডাগুলো সুনিপুণ ভাবে বাধা দিতে, যাতে তারা আরব মুসলিমদের সেই আশা পুরনে কখনও সফল হতে না পারে। প্রকৃতপক্ষে নতুন প্রজন্মের মুসলিম যুবকেরা যাদের ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান আছে (দ্বীনের ব্যাপারে তাদের অভিব্যক্তি দেখে যা বুঝা যায়), তারা আল কায়েদার সাথে যুক্ত দলের দিকে ঝুকে পড়বে – যারা প্যালেস্টাইনকে স্বাধীন করে এখানে ও পুরো বিশ্বে ইসলামিক শারিয়াহ প্রতিষ্ঠা করতে চায় (অর্থাৎ খিলাফাহ কায়েম করতে চায়)।

আরও সোজাভাবে বলতে গেলে, মোডারেট ইসলাম পন্থী সরকার বা গণতান্ত্রিক সরকার যারা কিছু নির্দিষ্ট ইসলামিক ব্যাপারে জনগণকে স্বাধীনতা দেয়, যা কিনা মুসলিমদের গতানুগতিক ইসলাম অনুভব করতে দেয়, এর দ্বারা তারা বুঝতে পারবে যে মুসলিম ব্রাদারহুড টাইপ সরকার পুরোপুরিভাবে ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করছে না; এর ফলে তারা আল কায়েদার দিকে ঝুকে পড়বে যাদের মধ্যে আদর্শিক ইসলামিক খিলাফতের প্রতিষ্ঠার জন্য বাস্তবিক অর্থেই অনুপ্রেরণা রয়েছে।

এর কারনে জায়নিস্টদের প্ল্যান উভয়সংকটের মধ্যে পড়েছে – হয় তাদের মুসলিম ব্রাদারহুডের দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার ব্যাপারে লড়াই করতে হবে, যার কারনে লোকেরা দ্রুত আল কায়েদার সাথে যোগ দিবে অথবা তারা মুসলিম ব্রাদারহুডকে তাদের দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগুতে দিবে, যা মুসলিমদেরকে আল কায়েদার খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আইডিয়ার সাথে একত্রিত করবে।

সিরিয়া : নতুন আফগানিস্তানঃ
সিরিয়া ৮০ ‘র দশকের আফগানিস্তানে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পরিনত হল, যেখানে বিশ্বের শক্তিগুলো একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলো এমন একটি প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যা তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য হবে, অপরদিকে ৮০ ‘র দশকের পাকিস্তানের ভুমিকায় অবতীর্ণ তুরস্ক পালিয়ে আশা আফগানদের আশ্রয় দিবে। বিদ্রোহীরা তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে ইসলামের দিকে ঝুকিয়ে নিল (পুরো বিশ্ব তাদের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করার পর)।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আশা মুজাহিদিনদের কারনে এ সম্ভাবনা দেখা গেল যে মুজাহিদিনের মাধ্যমে সিরিয়াতে ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হতে যাচ্ছে এবং আমেরিকা অথবা ইসরাইল সন্ত্রাস দূরীকরণের দোহাই দিয়ে তাকে আক্রমণ করতে যাবে।

আর এটা তো জানাই আছে যে ইসরাইল – আমেরিকা জোট ইতিমধ্যে ইসলামিক স্টেট অফ আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। ইহুদিদের ধর্ম গ্রন্থেই এই ভবিষ্যৎ বাণী উল্লেখ করা আছে যে দুর্নীতি পরায়ণ ইসরাইলের সাথে ইসরাইলের উত্তরের এক লোকের সাথে সংঘর্ষ ঘটবে এবং শেষ বিজয় হবে পাহাড়ি লোকদের। (ভবিষৎবাণীর অধ্যায়)।

যে দেশগুলোতে আমেরিকা এক যোগে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে সেগুলো হল ইরাক, ইয়েমেন, আফগানিস্তান এবং অতি শীঘ্রই সিরিয়া। এই দেশগুলো আন্তর্জাতিক ইসলামিক জিহাদের পুনরজাগরনের আসল কারন হতে পারে যা পরবর্তীতে শেষ যুগে সংঘটিত যুদ্ধের দিকে গড়াবে (যার ব্যাপারে মুসলিম,খ্রিস্টান ও ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থে বলা আছে) যার ফলে অবৈধ ইসরাইলের ধ্বংস হবে।

পরিশেষে বলা যায়, আমেরিকা মুসলিমদের বিরুদ্ধে এক লোভনীয় যুদ্ধ শুরু করার মাধ্যমে নিজেকে এবং ইসরাইলকে (জাকে সে রক্ষা করতে খুব ইচ্ছুক ) ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে।

আরব বসন্ত এবং আইএসের উত্থানঃ
গত চার বছর ধরে আরবরা সীমাহীন দুর্ভোগের অতলগহ্বরে বাস করছে। তাদের বহুল আলোচিত ‘আরব বসন্ত’ সুখের দিনের সম্ভাবনা জাগিয়ে শেষ পর্যন্ত অপ্রত্যাশিত দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। আরব বসন্তে আক্রান্ত বেশির ভাগ দেশেই প্রায় একই অবস্থা বিরাজ করছে।

স্বপ্নময় বিপ্লব প্রথমে পরিণত হয় বিরোধে, তা থেকে সৃষ্টি হয় সঙ্ঘাত এবং সেটা হয়ে পড়ে যুদ্ধ। এই নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থায় লণীয় ধরনের নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য ও অদ্ভুত সব চরিত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে। পুরো অঞ্চলে এসবের প্রবল উপস্থিতি ও প্রভাব দেখা যাচ্ছে, তারা সীমান্তগুলো মুছে দিয়েছে, কয়েক দশক ধরে যে কৌশলগত ভারসাম্য বিরাজ করছিল, সেটাকে বিলীন করে দিচ্ছে।

আরব বসন্ত-পূর্ব আমলে অরাষ্ট্রীয় কুশলীদের (অ্যাক্টর) প্রধানত হামাস, হিজবুল্লাহ ও আলকায়েদার মতো ইসলামি আন্দোলনগুলোর ভূমিকা ছিল সীমিত। অবশ্য নতুন অরাষ্ট্রীয় কুশলী এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করার আগে ইসলামি আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোকপাত করা জরুরি।

[ বি:দ্র: নমুনা উত্তর দাতা: রাকিব হোসেন সজল (বাংলা নিউজ এক্সপ্রেস)]

প্রথমত, এসব আন্দোলনকে রাজনৈতিক ইসলাম বা উদার ইসলাম হিসেবে অভিহিত করাটা স্রেফ বর্ণনামূলক পরিভাষা, ধর্ম হিসেবে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলাম একটি ব্যাপকভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তমূলক ধর্ম, অন্য কারো ভূমিকা ছাড়াই কোনো বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পারে। ফলে ইসলামের বিভিন্ন ধরন আছে, এমনটা বলা হলে ‘অ-উদার’ ইসলামের মতো অনেক কিছুর অস্তিত্ব রয়েছে বলে ভুল ধারণা দিতে পারে।

কেউ কেউ যুক্তি দেখাতে পারেন, এ ধরনের পরিভাষা প্রয়োগ আসলে স্রেফ ‘সৃষ্টিশীল’ বিষয়, বিভিন্ন ইসলামি গ্র“পের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ে কাজে লাগতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, পাশ্চাত্যের অনেক শক্তি ‘উদার ইসলামে’ এমন কোনো গ্রহণযোগ্য পরিভাষা পেতে পারে, যার মাধ্যমে সে নির্দিষ্ট গ্র“পগুলোর সাথে ‘কাজকাম’ চালিয়ে যেতে পারে।

কাজ চালিয়ে নেয়ার অর্থ ব্যাপক। এ দিয়ে মৌলিক ও নিয়মিত যোগাযোগ থেকে শুরু করে জোট বাঁধা এবং অভিন্ন স্বার্থ ও এজেন্ডা নির্ধারণও হতে পারে। আবার অনেক ইসলামি গ্র“পও উদার ইসলাম কিংবা রাজনৈতিক ইসলাম হিসেবে নিজেদের পরিচিত করতে কুণ্ঠিত হয় না।

সহিংস পন্থায় ল্য অর্জনে নিয়োজিত গ্র“পগুলো থেকে নিজেদের পার্থক্য বোঝাতে তারা এই পরিভাষাটি ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ‘উদার’ পরিচয় দিয়ে এসব গ্র“প অনেকটা বৈধতা পেয়ে থাকে, এর মাধ্যমে তারা তাদের সাফল্য অর্জনে নিজ নিজ সমাজে আরো স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম হয়।

সম্ভবত এসব গ্র“পকে ‘ইসলামকেন্দ্রিক আন্দোলন’ হিসেবে অভিহিত করাটাই হতে পারে অনেক বেশি নির্ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ তারা একটিমাত্র লক্ষ্যই পোষণ করে : ইসলামি শাসনে ফিরে যাওয়া তথা শরিয়ার আইন কার্যকর করা। পার্থক্য কেবল সময়ের।

আবার অরাষ্ট্রীয় কুশলীদের বিষয়ে আসা যাক। যে কেউ স্বীকার করে নেবে যে, আরব বিপ্লবের পর তাদের ভূমিকা হয়েছে অনেক বেশি প্রকট। তারা এখন এ অঞ্চলের অনেক প্রশাসন ও সরকারের ভূমিকাকেও ছাপিয়ে গেছে।

তারা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিকপর্যায়ে সুনির্দিষ্ট নীতি ও এজেন্ডা চাপিয়ে দিতে শুরু করেছে। প্রতিটি আঞ্চলিক সম্মেলন ও আন্তর্জাতিক সভায় তারাই সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব অ্যাক্টরের আত্মপ্রকাশে পুরো অঞ্চল অন্য দিকে ঘুরে গেছে।

অনেক বিধিনিষেধ গুঁড়িয়ে গেছে, একের পর এক দেশে তারা ঢুকে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে এখন বিশুদ্ধবাদ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। মুরতাদ, কাফির, নাস্তিক শব্দগুলো হরদম ব্যবহৃত হচ্ছে। যেকোনো সময় এসব কুশলী গত শতকের (১৯১৬ সালে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মধ্যে সম্পাদিত সাইকিস-পিকট চুক্তির মাধ্যমে, উসমানিয়া তুর্কি সাম্রাজ্য তারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছিল।

আরবদের নানা প্রলোভনে বশ করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে নিয়োজিত করেছিল) আঁকা প্রচলিত রাজনৈতিক সীমান্ত মুছে দিতে পারে। তারা এবং তাদের অঙ্গসংগঠনগুলো পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের অনেক নাম : আলকায়েদা, আননুসরা ফ্রন্ট, দায়েশ কিংবা আইএসআইএস বা আইএস, হুথি ইত্যাদি ইত্যাদি।

তাদের আত্মপ্রকাশে মনে হচ্ছে, কোনো পরিসীমা বা সীমান্ত নেই। বলা হয়ে থাকে, তারা এমন অত্যাধুনিক সংগঠন ধারণ করে আছে, যা তাদের সদস্য বা রিক্রুটের সংখ্যাকে অনেক গুণ ছাড়িয়ে গেছে। অন্য কথায়, তাদের সদস্যসংখ্যায় কোনোভাবেই এ ধরনের সংক্ষিপ্ত সময়ে নজিরবিহীন ‘অর্জন’ প্রতিফলিত হচ্ছে না।

এই অদ্ভুত সমীকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে তাদের পরিচিত ও অপরিচিত মিত্রদের নেটওয়ার্ক। তারাই তাদের অর্থ, কৌশলগত সমর্থন ও অস্ত্র দিচ্ছে। এসব মিত্র থাকছে স্পটলাইট থেকে অনেক দূরে। ইরাক ও সিরিয়ার পরিস্থিতি এক দিকে জটিল স্বার্থ ও সম্পর্ক এবং অন্য দিকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইতস্ততার চোখে পড়ার মতো উদাহরণ।

অনেক আঞ্চলিক শক্তি অন্যান্য ফ্রন্টের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি হঠাৎ বদলাচ্ছে কিংবা হিজবুল্লাহ বা পিকেকে কিংবা এমনকি আসাদ সরকারকে দুর্বল করার লক্ষ্যে এসব অরাষ্ট্রীয় কুশলীদের সমর্থন দিচ্ছে কিংবা তাদের দেখেও না দেখার ভান করেছে। একইভাবে হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে অভিহিতকারী পাশ্চাত্যের শক্তিগুলো তাদের অপছন্দনীয়দের তাড়াতে এসব কুশলীর সিরিয়ায় প্রকাশ্য ভূমিকার প্রতি মৌনসম্মতি দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এই শক্তিকে ব্যবহার করার সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে। সে তার আরব মিত্রদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করেছে, তাদের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করেছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি যে রাশিয়ার অর্থনীতিকে (এর ফলে তেহরান প্রধান তেল রফতানিকারকে পরিণত হবে, পরিণতিতে তেলের দাম কমে যাবে) ক্ষতিগ্রস্ত করবে সে ব্যাপারে দেশটি পুরোপুরি সচেতন থাকলেও তার কিছু করার নেই।

সে ইরানের প্রধানত অরাষ্ট্রীয় কুশলীদের সাথে ইরানের সম্পর্ক এবং নেটওয়ার্ক সম্পর্কে ভালোভাবেই জানে।
আশ্চর্য বিষয় হলো এবং অরাষ্ট্রীয় কুশলীদের অস্তিত্ব আঞ্চলিক আতঙ্ক আর নতুন সাইকিস-পিকট চুক্তি নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা করতে তাদের অস্বীকৃতি সত্ত্বেও যে-কেউ বুঝতে পারছে যে, পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সে দিকেই যাচ্ছে।

আমেরিকা আইএসআইএসের ওপর হামলা চালানোর মধ্যেই গ্রুপটি ইরাক ও সিরিয়ার বিপুল এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। মজার ব্যাপার হলো, মার্কিন হামলার আগে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা ছিল অনেক কম।

আইএসআইএসের যোদ্ধাদের আরো বেশি আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত এবং প্রশিক্ষিত মনে হচ্ছে, তাদের মিডিয়া কর্মদক্ষতা অনেক বেড়েছে। আইএসআইএসের উপর্যুপরি সাফল্য অন্যদেরও এই মডেল অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এর ফলে কোনো আরব রাজধানীই সুরক্ষিত নয়, বিশেষ করে তথাকথিত আরব বসন্তের ঘটনাবলির পর।

[ বি:দ্র: নমুনা উত্তর দাতা: রাকিব হোসেন সজল (বাংলা নিউজ এক্সপ্রেস)]

Leave a Comment