১ জুলাই থেকে আটকে থাকা সেমিস্টারগুলোর চূড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহণের নোটিশ

১ জুলাই থেকে আটকে থাকা সেমিস্টারগুলোর চূড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহণের নোটিশ

Notice জাতীয় দেশ
শেয়ার করুন:

আবাসিক হল বন্ধ রাখার শর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বিভিন্ন বিভাগের স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের আটকে থাকা চূড়ান্ত পরীক্ষাগুলো নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে বিভাগগুলোর সমন্বয়হীনতায় চরম বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। অধিকাংশ বিভাগ আগামী ১ জুলাই থেকে আটকে থাকা সেমিস্টারগুলোর চূড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহণের নোটিশ দিয়েছে। সাথে শিক্ষার্থীদের জানানো হয়েছে, করোনা পরিস্থিতির কারণে সশরীরে পরীক্ষা গ্রহণ সম্ভব না হলে একই সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষাসমূহ অনলাইনে অনুষ্ঠিত হবে।

বিভাগগুলোর পরীক্ষা গ্রহণ বিষয়ে এমন অস্পষ্টতায় শিক্ষার্থীদের মাঝে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যারা ঢাকার বাইরে থাকেন তাদের জন্য এই স্বল্প সময়ে মেস বা বাসা খুঁজে বের করা অসম্ভব। তারা এরমধ্যে ঢাকায় এসে বাসা ভাড়ার ব্যবস্থা করবেন, নাকি বাসায় থেকে অনলাইন পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন- তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে পড়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের আবাসিক ছাত্রী নাঈমা তাবাসসুম। করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধায় আছেন। তিনি বলছেন, ‘আবাসিক হল বন্ধ রেখে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তটি অযৌক্তিক।’ নাঈমা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘হল বন্ধ থাকলে করোনার এই সময়ে ঢাকায় গিয়ে আমরা কোথায় থাকব? ঢাকায় যাঁদের আত্মীয়-স্বজনের বাসা আছে, তাঁরাও করোনার সময়ে থাকার জায়গা পাবেন কি না সন্দেহ। বাসা ভাড়া করার জন্য অগ্রিম টাকা লাগে। করোনার সময়ে অনেক পরিবারের টিকে থাকাই যেখানে কঠিন হয়ে পড়েছে, সেখানে বাসা ভাড়া করার মতো সামর্থ্য কয়জনের আছে?’

অন্যদিকে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলায় কঠোর লকডাউন দেওয়ার সুপারিশ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সশরীরে উপস্থিত হয়ে পরীক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এসব জেলায় লকডাউন দেওয়া হলে সশরীরে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।

এদিকে বিভাগগুলোর এমন সিদ্ধান্তের পর অনেক শিক্ষার্থী ‘বাসা বা মেস ভাড়া নেবেন কি-নেবেন না’ এমন শঙ্কা প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের মত তুলে ধরছেন। অনেক শিক্ষার্থী দ্বিধাবোধ থেকে হতাশা সৃষ্টি হচ্ছে বলে মতামত প্রকাশ করছেন। সশরীরে পরীক্ষা হতে পারে এমন সম্ভাবনায় বাসা বা মেস ভাড়া নিয়েও পরবর্তীতে লকডাউনের ফলে পরীক্ষা না হলেও তাদের বাসা ভাড়া দিয়ে যেতে হবে। এটি তাদের পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে বলে অনেকের অভিমত।

জানা গেছে, হল না খোলার শর্তে সশরীরে পরীক্ষার সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করে এবং ধাপে ধাপে পরীক্ষার্থীদের জন্য হল খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। ‘হল-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দাও আন্দোলন’ প্ল্যাটফর্মে তারা আন্দোলন করে আসছেন। ঢাকার বাইরে থাকা বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঢাকায় এসে কোথায় থাকবেন, কী করবেন- তার কোনো নিশ্চয়তা না দিয়ে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, এমন অভিযোগও রয়েছে শিক্ষার্থীদের।

আইইআরের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুন্না রহমান বলেন, ‘আমি পরীক্ষাগুলো হয়ে যাওয়ার পক্ষে। এমনিতেই আমাদের এক বছরের সেশনজট পড়ে গেছে। এ বছরও যদি তৃতীয় এবং চতুর্থ সেমিস্টার সম্পন্ন না করে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বেশি ঝামেলা হবে। তবে হল না খুলে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টা একটু খারাপ লাগছে। কেননা অনলাইনে পরীক্ষা নিলেও অনেকের এলাকায় নেটওয়ার্ক সমস্যা রয়েছে, অনেকের ডিভাইস নেই।’

দর্শন বিভাগের ২০১৭-১৮ সেশনের শিক্ষার্থী আমানউল্লাহ রিয়াজ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মোটেও শিক্ষার্থীবান্ধব আচরণ করছে না। হল না খুলে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থেকে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেকটা- মরার উপর খাঁড়ার ঘা। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি এক ধরনের মানসিক এবং অর্থনৈতিক নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে। যেহেতু সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় করোনার প্রকোপ বাড়ছে, ঢাকায় এসে যদি আবার করোনার জন্য পরীক্ষা স্থগিত করা হয়, তখন আমরা উভয় সংকটে পড়বো।’

অনলাইন পরীক্ষায় যত বাধা

গত বছরের জুলাইয়ের শুরু থেকেই পুরোদমে অনলাইন ক্লাস কার্যক্রম শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ বিভাগ। তবে শিক্ষার্থীদের অনেকেই নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার কারণে অংশ নিতে পারেনি এসব ক্লাসে। প্রয়োজনীয় ডিভাইস না থাকা, নেটওয়ার্ক সমস্যা, অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতাসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে অনলাইন ক্লাসে ‍যুক্ত হতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা।

এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুস সামাদ কয়েকদিন আগে বলেছেন, ‘অনলাইন ক্লাসে আমাদের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ৪৫ শতাংশের মত। আরও ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসের বাইরে।’ যেখানে অনলাইন ক্লাসে এত পরিমাণ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত, তাদেরকে রেখে অনলাইনে পরীক্ষা নেয়া অযৌক্তিক মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথমে যখন অনলাইন ক্লাসের কথা বলেছিলাম, তখন বলেছি শুধুমাত্র ক্লাস অনলাইনে হবে। পরীক্ষা সশরীরে হবে। এখন অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার মত। আমাদের এক্ষেত্রে আরও বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।’

অন্যদিকে ‘টেক হোম’ পদ্ধতিতে পরীক্ষার দাবি জানিয়ে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে শিক্ষার্থীদের একাংশ। যেখানে শিক্ষকরা অনলাইনে প্রশ্ন দেবে, আর শিক্ষার্থীরা অফলাইনে উত্তর লিখে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উত্তরপত্র জমা দেবে।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, হল না খুলে পরীক্ষা নেওয়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কারণ হবে। হল খুলে পরীক্ষা নেওয়ার দাবি সার্বজনীন্ তবে এখন হল খুলে দেয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে টেক-হোম এক্সামের মাধ্যমে পরীক্ষা নেয়াটাই সবচেয়ে ভাল বাস্তবসম্মত সমাধান। নিরবচ্ছিন ইন্টারনেট সংযোগের অপ্রতুলতা, পর্যাপ্ত ডিভাইসের স্বল্পতা, আর্থ-সামাজিক অবস্থার দরুন অনলাইন লাইভ পরীক্ষার বিড়ম্বনার কথা উপাচার্যের কাছে তুলে ধরেন শিক্ষার্থীরা।

ছাত্রসংগঠনগুলো কী বলছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনগুলো অনেকদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার রোডম্যাপ ঘোষণা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্রুত টিকা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছেন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট বিভাগে সকল শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী এবং তাদের মতামত সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। যেহেতু সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় প্রকোপ বাড়ছে, ঢাকায় এসে হুট করে কোথাও থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আর্থিকভাবেও সক্ষম না। বাস্তবতার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ না। একজন শিক্ষার্থীও যদি অধিকার বঞ্চিত হয় বা কোনো শিক্ষার্থী যদি সমসুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, কোনোভাবেই এটা আমরা সমর্থন করিনা।’

তিনি বলেন, অবশ্যই শিক্ষার্থীদের মতামতের আলোকে এবং শিক্ষার্থীরা যে ধরণের বাস্তবসম্মত রূপরেখা দেয় সেটির আলোকে সকল বিভাগকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। ভ্যাকসিনেশন যদি সময়সাপেক্ষ হয় সেক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীদের জন্য হলগুলো উন্মুক্ত করা যায় কিনা সেটিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বিবেচনা করতে হবে।’

ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা হলে থাকে তাদের অনেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসে, যাদের ঢাকায় এসে এখানে মেসে থাকার মতো সামর্থ্য নেই। অবশ্যই সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সুনজর দেয়া উচিত ছিল যে, হল খুলে দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া। যদি অনলাইনে নিতে হয় তাহলে শিক্ষার্থীদের ডিভাইস নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার জন্য রোডম্যাপ ঘোষণা করা জরুরি।’

এ সময় বাসস্থান নিশ্চিত করে পরীক্ষা নেওয়া ও শিক্ষার্থীদের দ্রুত সময়ের মধ্যে ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানান তিনি। ফয়েজ উল্লাহ বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা কবে ভ্যাকসিন পাবে এটা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে। এভাবে অপরিকল্পিতভাবে যদি বিশ্ববিদ্যালয় চলে, শিক্ষার্থীদের মাঝে যে হতাশা এবং পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার যে সংকট, তা আরও বেশি বাড়বে। হল খুলে দিয়ে প্রত্যেকটা শিক্ষার্থীর বাসস্থান নিশ্চিত করে তারপরে পরীক্ষা নেওয়া হোক।’

তবে এ বিষয়ে কথা বলতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসচিব আমানুল্লাহ আমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তা ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

শেয়ার করুন:

আপনার মূল্যবান মতামত দিন